ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে চায় সরকার
****বাংলা কিউআরের আন্তঃসংযোগে জোর, এক প্ল্যাটফর্মে আসবে বিভিন্ন সেবা
****ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাকিংয়ে কর ব্যবস্থায় কমতে পারে অযৌক্তিক চাপ
****অটোমেশন ও এআই ব্যবহারে ব্যবসার খরচ কমানোর পরিকল্পনা
নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে দেশে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি বাড়াতে চায় সরকার। অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে একদিকে দুর্নীতির সুযোগ কমবে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও কমে আসবে। একই সঙ্গে কর আদায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব রাখা এবং নীতিনির্ধারণে তথ্য ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ক্যাশলেস অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ডিজিটাল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ঘটানো গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমবে।
লেনদেনের রেকর্ডে বাড়বে স্বচ্ছতা: নগদ অর্থের লেনদেনে অনেক সময় অর্থের উৎস ও গন্তব্যের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষিত থাকে না। ফলে কোনো আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটলে পরে সেটির গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল লেনদেন এ জায়গায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন প্রতিটি লেনদেনের একটি তথ্যভিত্তিক রেকর্ড তৈরি হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি বোঝা এবং প্রয়োজন হলে লেনদেনের তথ্য অনুসরণ করা সহজ হবে। এর ফলে কর আদায়ের ক্ষেত্রেও সুবিধা তৈরি হবে।
শুধু রাজস্ব আদায় নয়, অর্থনীতির বিভিন্ন খাত থেকে সংগৃহীত তথ্য নীতিনির্ধারণেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। কোন খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে, কোথায় বিনিয়োগের প্রবাহ বেশি কিংবা কোন খাতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ: ক্যাশলেস লেনদেনের বিস্তার ঘটাতে বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর ও গতিশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে আন্তঃসংযোগ বা ইন্টারঅপারেবিলিটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে ব্যাংক ও বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মধ্যে লেনদেনের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে একটি কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষ ও ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থ গ্রহণের পরিবর্তে কিউআরভিত্তিক পেমেন্টের সুযোগ বাড়লে ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ সহজ হবে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি ও খরচও কমতে পারে।
করের চাপ কমানোর সুযোগ: ব্যবসায়ী ও করদাতাদের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো, সঠিক তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কর প্রশাসনের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হয়। কোনো কোনো ব্যবসায়ী বা করদাতার ওপর বারবার করের চাপ বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব। ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে কর নির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারে। এতে করদাতাদের ওপর অযৌক্তিক চাপ কমানোর পাশাপাশি কর ফাঁকির সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।
তবে এর জন্য ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। মানুষের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক আর্থিক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।
দপ্তরে দপ্তরে ছুটতে হবে না: ক্যাশলেস অর্থনীতির সঙ্গে শুধু অর্থ লেনদেন নয়, সরকারি সেবাকেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার বিষয়টি যুক্ত হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত হলে নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবা নিতে বারবার দপ্তরে গিয়ে সময় নষ্ট করতে হবে না। অনেক সেবা ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব হবে।
এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সরকারি সেবায় সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনও কমবে। আর যেখানে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে শারীরিক উপস্থিতি ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কমে যায়, সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগও কমানোর সম্ভাবনা থাকে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যতটা সম্ভব ফিজিক্যাল কন্টাক্টের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ওপর তাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় যাচাই ও ইলেকট্রনিক অনুমোদনের মতো ব্যবস্থা বিস্তৃত করা গেলে সরকারি-বেসরকারি সেবায় সময় ও খরচ উভয়ই কমতে পারে।
ব্যবসার খরচ কমাতে অটোমেশন: ক্যাশলেস লেনদেনের পাশাপাশি ব্যবসায় অটোমেশন বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। অর্থমন্ত্রীর মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কমিয়ে আনা সম্ভব।
বন্দর থেকে বিমানবন্দর অর্থনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রযুক্তি ও অটোমেশন যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। পণ্য আমদানি-রপ্তানি, কাস্টমস, পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়া যত বেশি স্বয়ংক্রিয় হবে, ব্যবসায়ীদের সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় তত কমতে পারে।
এর ফলে বাংলাদেশের ব্যবসা শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা ও কম লেনদেন ব্যয় দেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ: ডিজিটাল অর্থনীতির পরবর্তী ধাপ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এআইকে ব্যবসা ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
ব্যবসার হিসাব ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বড় পরিবর্তনের সামনে বাংলাদেশ: ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমলে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ সহজ হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়বে এবং কর ব্যবস্থাপনাকে আরও তথ্যভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি সেবায় সরাসরি যোগাযোগ ও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন কমলে দুর্নীতির কিছু সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।
তবে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করাই শেষ কথা নয়। ডিজিটাল অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা এবং সহজলভ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা না গেলে ক্যাশলেস অর্থনীতির সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।
সব মিলিয়ে সরকারের পরিকল্পনা শুধু নগদ অর্থের বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং লেনদেন, কর ব্যবস্থা, সরকারি সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। অর্থমন্ত্রী যে স্বচ্ছতা, কম দুর্নীতি ও কম ব্যবসায়িক ব্যয়ের কথা বলছেন, তা বাস্তবে কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে—তা নির্ভর করবে ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার, আন্তঃসংযোগ এবং কার্যকর নজরদারি কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।



















