বিএমইটির পরিচালক মাসুদ রানার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, বিদেশগামী শ্রমিকদের হয়রানি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে।
গত ১২ মে মো. মন্টু মিয়া নামের এক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা ধরনের হয়রানি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, বিএমইটির প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার সুবাদে বিদেশগামী কর্মীদের বিভিন্ন ফাইল ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি করে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকায় তলব করে নিজের কক্ষে বৈঠক করেন মাসুদ রানা। পরে তাঁদের ইচ্ছামতো বদলি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বৈঠকের সময় অনেক ক্ষেত্রে তাঁর কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকত বলেও অভিযোগকারী দাবি করেছেন।
মন্টু মিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে মাসুদ রানা নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে বিএমইটিতে প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বিএমইটির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব রয়েছে। নতুন মহাপরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তাঁকে বিএমইটির ‘অঘোষিত ডিজি’ হিসেবে মনে করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান-নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা এলাকায় দুটি বাড়ি, সাভারে কয়েক বিঘা জমি এবং নেত্রকোনার গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমান জমি ও বিলাসবহুল বাড়ি থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশেও তাঁর সম্পদ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় তাঁর ‘মাই সেকেন্ড হোম’ রয়েছে। এ ছাড়া দুবাইয়ে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সঙ্গে জনশক্তি ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, ভিলা এবং স্বর্ণের ব্যবসার সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক হিসাব, বিদেশি ব্যবসা কিংবা সম্পদের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে মাসুদ রানার কথিত অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দুর্নীতির আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। অভিযোগে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরিচালক মো. মাসুদ রানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে অভিযোগকারীর দাবি ও সম্পদসংক্রান্ত প্রশ্নের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল কেটে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো তদন্তের ফলাফল বা অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাঁর সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং দেশে-বিদেশে ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।


















