Dhaka ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৌসুমি নয়, বছরজুড়ে ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

***সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৪৩ হাজারের বেশি রোগী
***সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই প্রাণ গেল ২৪ জনের
***ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণ
***মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে সচেতনতার তাগিদ

একসময় ডেঙ্গুকে বর্ষাকেন্দ্রিক বা মৌসুমি রোগ হিসেবেই বেশি পরিচিতি দেওয়া হতো। বর্ষা এলেই বাড়ত এডিস মশার উপদ্রব, আর সঙ্গে দেখা দিত ডেঙ্গুর প্রকোপ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন আর বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাসে সীমাবদ্ধ নেই ডেঙ্গু। কমবেশি সারা বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বর্ষা এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা শুরুর পর দ্রুত বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। এখন মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৯০৪ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১২১ জনের। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ হাজার ৭০৯ জন। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ক্রমেই বেড়েছে। জুন মাসে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ জনে। আগস্টে মৃত্যু হয় আরও ৪৩ জনের। আর সেপ্টেম্বরের শুরুতেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। মাসের প্রথম কয়েক দিনেই ২৪ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ।

বদলে গেছে ডেঙ্গুর চেনা চিত্র: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ের রোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এখন বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মৌসুমি উদ্যোগ নিলেই আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন স্থাপনায় পানি জমে থাকা এবং ঘরবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন পাত্রে পরিষ্কার পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়েই মশার বংশবিস্তার অব্যাহত থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্ষার সময় এই পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়ে ওঠায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রোগী বাড়ার পর উদ্যোগ নিলে হবে না। বছরের শুরু থেকেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

বাড়ছে হাসপাতালের ওপর চাপ: ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চিকিৎসার চাপ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়তে পারে। তাই শুধু শয্যা বাড়ালেই যথেষ্ট হবে না; চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করাও জরুরি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ডেঙ্গু আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। বিভাগ ও জেলাগুলোতেও রোগী বাড়ছে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সচেতনতায় এখনও ঘাটতি: ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ থাকলেও প্রয়োজনীয় সচেতনতার ঘাটতি এখনো রয়েছে। অনেকেই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ ভালোভাবে পরিষ্কার করা, কোথাও পানি জমে আছে কি না তা খেয়াল রাখা এবং জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরিস্থিতি জটিল হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

বছরজুড়ে প্রস্তুতির বিকল্প নেই: ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করছে এ রোগকে আর শুধু মৌসুমি সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বছরের নির্দিষ্ট সময় এলেই অভিযান চালানো কিংবা মশা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়ার পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন বছরজুড়ে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি।

এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, কোথায় রোগী বাড়ছে এবং কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। নিজের বাসা, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

চলতি বছরের মৃত্যু ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান আবারও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষার কয়েক মাসের আতঙ্ক নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে এর উপস্থিতি এবং বর্ষাকালে ভয়াবহ বিস্তার প্রমাণ করছে, এ রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সারা বছরের প্রস্তুতি। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি বছরই একই আতঙ্ক ফিরে আসবে, আর বাড়তে থাকবে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা।

মৌসুমি রোগের পুরোনো ধারণা বদলে দিয়ে ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের নাম। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং বছরের প্রতিটি দিন মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ।

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

14 − ten =

About Author Information

মৌসুমি নয়, বছরজুড়ে ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে

Update Time : ০৬:০৩:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

***সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৪৩ হাজারের বেশি রোগী
***সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই প্রাণ গেল ২৪ জনের
***ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণ
***মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে সচেতনতার তাগিদ

একসময় ডেঙ্গুকে বর্ষাকেন্দ্রিক বা মৌসুমি রোগ হিসেবেই বেশি পরিচিতি দেওয়া হতো। বর্ষা এলেই বাড়ত এডিস মশার উপদ্রব, আর সঙ্গে দেখা দিত ডেঙ্গুর প্রকোপ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন আর বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাসে সীমাবদ্ধ নেই ডেঙ্গু। কমবেশি সারা বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বর্ষা এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা শুরুর পর দ্রুত বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। এখন মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৯০৪ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১২১ জনের। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪০ হাজার ৭০৯ জন। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ক্রমেই বেড়েছে। জুন মাসে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ জনে। আগস্টে মৃত্যু হয় আরও ৪৩ জনের। আর সেপ্টেম্বরের শুরুতেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। মাসের প্রথম কয়েক দিনেই ২৪ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ।

বদলে গেছে ডেঙ্গুর চেনা চিত্র: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ের রোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এখন বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মৌসুমি উদ্যোগ নিলেই আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন স্থাপনায় পানি জমে থাকা এবং ঘরবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন পাত্রে পরিষ্কার পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়েই মশার বংশবিস্তার অব্যাহত থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্ষার সময় এই পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়ে ওঠায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রোগী বাড়ার পর উদ্যোগ নিলে হবে না। বছরের শুরু থেকেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

বাড়ছে হাসপাতালের ওপর চাপ: ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চিকিৎসার চাপ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়তে পারে। তাই শুধু শয্যা বাড়ালেই যথেষ্ট হবে না; চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করাও জরুরি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ডেঙ্গু আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। বিভাগ ও জেলাগুলোতেও রোগী বাড়ছে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সচেতনতায় এখনও ঘাটতি: ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ থাকলেও প্রয়োজনীয় সচেতনতার ঘাটতি এখনো রয়েছে। অনেকেই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ ভালোভাবে পরিষ্কার করা, কোথাও পানি জমে আছে কি না তা খেয়াল রাখা এবং জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরিস্থিতি জটিল হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

বছরজুড়ে প্রস্তুতির বিকল্প নেই: ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করছে এ রোগকে আর শুধু মৌসুমি সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বছরের নির্দিষ্ট সময় এলেই অভিযান চালানো কিংবা মশা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়ার পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন বছরজুড়ে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি।

এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, কোথায় রোগী বাড়ছে এবং কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। নিজের বাসা, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

চলতি বছরের মৃত্যু ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান আবারও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষার কয়েক মাসের আতঙ্ক নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে এর উপস্থিতি এবং বর্ষাকালে ভয়াবহ বিস্তার প্রমাণ করছে, এ রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সারা বছরের প্রস্তুতি। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি বছরই একই আতঙ্ক ফিরে আসবে, আর বাড়তে থাকবে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা।

মৌসুমি রোগের পুরোনো ধারণা বদলে দিয়ে ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের নাম। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং বছরের প্রতিটি দিন মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ।