রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে স্থবির জনজীবন
****সব জেলায় বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
****৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত
*****তলিয়ে গেছে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা
*****ব্যাহত যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবা
******বাড়ছে পাহাড়ধসের শঙ্কা
টানা অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে নজিরবিহীন জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ দৈনন্দিন কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। একই সঙ্গে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যাওয়ায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৬ জুলাই) বিকেল ৩টা থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি গত ৪২ বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পানির নিচে নগরের প্রধান সড়ক
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দিনভর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাদামতলী, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, মোহরা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, হালিশহর, পতেঙ্গা, সিটি গেট, বহদ্দারহাট ও শোলশহরসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও সড়ক ও ড্রেনের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতার কারণে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে যায়। গণপরিবহন সংকটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দুর্ভোগ
জলাবদ্ধতার মধ্যেই বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকেই ভেজা পোশাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছায়।
অন্যদিকে বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলায় পানি ঢুকে জরুরি বিভাগ, ল্যাবরেটরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাভাবিক জীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে
নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এবারই সবচেয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। অনেক এলাকায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বাসা থেকে বের হওয়া এবং কর্মস্থলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে সতর্ক প্রশাসন
টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবস্থান না করার আহ্বান জানান তিনি।
পানি নিষ্কাশনে মাঠে প্রশাসন ও সেনাবাহিনী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৯ থেকে ১০টি ওয়ার্ড জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বোর্ডের সব জেলায় বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত: টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলায় বুধবার (৮ জুলাই) অনুষ্ঠেয় এইচএসসি, আলিম ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত পরীক্ষা আপাতত হচ্ছে না। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।



















