রোগ নির্ণয়ে ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমাতে চায় সরকার
***সাত বিভাগীয় হাসপাতালে বসছে আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্র
***এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বাড়ছে উন্নত পরীক্ষার সুযোগ
***রাজধানী ও বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য
***প্রায় ৩৭০ কোটি টাকায় আধুনিকায়নের বড় উদ্যোগ
উন্নত রোগ নির্ণয়ের জন্য রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমাতে বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, ডিজিটাল এক্স-রে, ম্যামোগ্রাফিসহ বিভিন্ন আধুনিক রোগ নির্ণয় সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ জন্য দুটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন মিললে পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীদের ঢাকায় আসতে হয়। বিশেষ করে জটিল রোগ শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালের বাইরে করাতে গিয়ে রোগীদের সময় ও অর্থ—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ নিতে হয়।
এই পরিস্থিতি বদলাতে ঢাকাসহ দেশের সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থা আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও বরিশালের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নতুন যন্ত্রপাতি পাবে।
আধুনিক যন্ত্রে বাড়বে পরীক্ষার সুযোগ: পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে একাধিক ধরনের উন্নত রোগ নির্ণয় যন্ত্র বসানো হবে। এর মধ্যে রয়েছে এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, ডিজিটাল এক্স-রে, ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসনোগ্রাফি। পাশাপাশি গ্যাস্ট্রোস্কোপি ও কোলনোস্কোপির মতো পরীক্ষার সরঞ্জামও কেনার কথা রয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় দুটি প্যাকেজে এসব যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি প্যাকেজে ডিজিটাল এক্স-রে, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, গ্যাস্ট্রোস্কোপি, কোলনোস্কোপি এবং প্যাক্স/রিস ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরেকটি প্যাকেজে থাকছে এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসনোগ্রাফি।
এসব যন্ত্র স্থাপিত হলে বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জটিল রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ দ্রুত শনাক্তের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নারী ও শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা নির্ণয়েও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমানোর লক্ষ্য: বর্তমানে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে উন্নত ইমেজিং ও রোগ নির্ণয় সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতাল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা ও পরীক্ষা–নিরীক্ষার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানীতে আসেন। এতে শুধু রোগীদের যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে না, রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক ইমেজিং যন্ত্রপাতির সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের রাজধানী কিংবা বেসরকারি হাসপাতালের দিকে যেতে হয়। এমআরআই, সিটি স্ক্যান, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি ও ম্যামোগ্রাফির মতো পরীক্ষার সুবিধা সরকারি হাসপাতালে সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালেই এসব পরীক্ষার সুযোগ বাড়বে। ফলে দূরের কোনো রোগীকে শুধু একটি উন্নত পরীক্ষা করানোর জন্য রাজধানীতে আসতে হবে না এমন পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্য রয়েছে উদ্যোগটির পেছনে।
প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার দুই প্যাকেজ: যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দুটি পৃথক প্যাকেজে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৩০৬ টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে প্রস্তাব দুটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্বাচিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হবে। এরপর যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
প্রথম প্যাকেজের আওতায় থাকা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ২১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ প্যাকেজে সর্বনিম্ন ও যোগ্য দরদাতা হিসেবে জাপানের এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০২ কোটি টাকার বেশি।
অন্য প্যাকেজে এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র কেনার জন্য ২১৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ প্যাকেজে ব্যয় হবে ১৬৭ কোটি টাকার বেশি। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ফুজিফিল্ম হেলথ কেয়ার এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লিমিটেড এবং ফুজিফিল্ম মিডল ইস্ট এফজেডইর যৌথ উদ্যোগকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
বরাদ্দের চেয়ে কম ব্যয়ে কেনার প্রস্তাব: দুটি প্যাকেজ মিলিয়ে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে মোট বরাদ্দ রয়েছে ৪২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
অর্থাৎ নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৬০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা কম ব্যয়ে দুটি প্যাকেজ বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যয় সরকারি প্রাক্কলনের মধ্যেই রয়েছে।
ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অনাপত্তিও নেওয়া হয়েছে।
এর আগে প্রথম দফার দরপত্র প্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না পাওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে সংশ্লিষ্ট দুটি প্যাকেজের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিভাগীয় পর্যায়ে বাড়বে সক্ষমতা: সরকারের প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা বাড়ানো। এর মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন জটিল রোগ শনাক্তের সুযোগ বাড়বে।
বর্তমানে অনেক রোগীকে উন্নত পরীক্ষা করানোর জন্য রাজধানী বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। সরকারি হাসপাতালেই যদি এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা বাড়ে, তাহলে রোগীদের চিকিৎসার খরচ কমার পাশাপাশি সময়ও সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও আধুনিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
স্বাস্থ্য খাতের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ভূমিকা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রোগ নির্ণয়ের জন্য রাজধানীমুখী মানুষের চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সুফল পেতে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনই যথেষ্ট নয়। যন্ত্র পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা এবং রোগীদের জন্য সহজলভ্য করা গেলে তবেই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য পূরণ হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়ার কথা।
সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উন্নত পরীক্ষা করাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটতে হওয়া রোগীদের ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




















