ইঞ্জিন সংকটে রেলের মালবাহী পরিবহনের আয় কমেছে ২৩.৫৬ শতাংশ
লোকোমোটিভের অভাবে নিয়মিত চলছে না চট্টগ্রাম-ঢাকা কনটেইনার ট্রেন। পণ্য পরিবহনে বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কমছে রেলের আয়, ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।
বন্দর থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনে রেলওয়ের সক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। এতে রেলপথের বদলে সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালবাহী পরিবহন থেকে আয়ে। গত তিন অর্থবছরে এ খাতে রেলের আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওয়াগনের মাধ্যমে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমে ৭ লাখ ৭ হাজার ২৩ টনে নেমে আসে। ওই বছর আয় হয় ৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য পরিবহন আরও কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টনে। এ সময়ে আয় হয় ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ও আয় কমার পাশাপাশি মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহৃত ওয়াগনের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ হাজার ৭১৯টি ওয়াগন ব্যবহার করা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে হয় ৬৩ হাজার ১০০টি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যবহৃত ওয়াগনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৬৯টিতে।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মালবাহী ট্রেনের জন্য পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ বরাদ্দ করা যাচ্ছে না। সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিনের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, লোকোমোটিভের সংকটে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগের মতো নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখার সুযোগ না থাকায় প্রথমে সেগুলোর জন্য ইঞ্জিন বরাদ্দ দিতে হয়। এরপর অবশিষ্ট ইঞ্জিন দিয়ে মালবাহী ট্রেন চালাতে হচ্ছে। তাঁর হিসাবে, কনটেইনার ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিন তিন থেকে চারটি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
কমলাপুর আইসিডিতে কমেছে কনটেইনার চলাচল: লোকোমোটিভ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি)। ট্রেনের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে সেখানে কনটেইনার আসা-যাওয়া কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে এবং খালি কনটেইনার ও রপ্তানিপণ্যবোঝাই কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানোর কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কমলাপুর আইসিডির তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় সর্বশেষ জুলাইয়ে ডিপোটির প্রধান কার্যক্রমের সূচকগুলোতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিল অব এন্ট্রি দাখিল কমেছে ৩৩ দশমিক ০৯ শতাংশ, কনটেইনার চলাচল কমেছে ৪৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ, মূল্যায়নযোগ্য মূল্য ও রাজস্ব আদায়েও পতন হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরের জুলাইয়ে কমলাপুর আইসিডিতে ৮২২টি বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়েছিল। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে ৫৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। কনটেইনার চলাচল ১ হাজার ৫৭৯টি থেকে নেমে এসেছে ৮৩৬টিতে। মূল্যায়নযোগ্য পণ্যের মূল্য ৬৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। আর রাজস্ব আদায় ২৯৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ২৬ লাখ টাকায়।
কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির কমিশনার (কাস্টমস) কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এ পরিস্থিতির জন্য রেলের ইঞ্জিন সংকটকে দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নিয়মিত মালবাহী ট্রেন না আসায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করছেন। কনটেইনার চলাচল কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে শুল্ক রাজস্ব আদায়েও।
চাহিদার তুলনায় ট্রেন সরবরাহ অনেক কম: কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার ট্রেনের স্বল্পতা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও উদ্বেগ জানিয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় গত ১০ আগস্ট ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানায় সংস্থাটি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় কমলাপুর আইসিডির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৯০টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। মে মাসে ৩২টি, জুনে ৪৪টি এবং জুলাইয়ে মাত্র ৩৬টি ট্রেন সরবরাহ করা হয়। এতে মাসিক চাহিদার তুলনায় ট্রেনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকছে।
ট্রেনের এই ঘাটতিতে আমদানি করা পণ্য সময়মতো খালাস করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি খালি কনটেইনার ও রপ্তানিপণ্যবোঝাই কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানোর ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে জট। ফলে আইসিডিতে কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকছে। এতে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও শিপিং এজেন্টদের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি শিপিং লাইন কমলাপুর আইসিডির পরিবর্তে বিকল্প টার্মিনাল বা বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এতে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিঠিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ১৮ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়।
স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ে আরও বিঘ্ন ঠেকাতে প্রতিদিন অন্তত তিনটি করে মাসে ৯০টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (আইসিডি, কমলাপুর) মোহাম্মদ আশরাফ করিম চৌধুরী বলেন, তাঁরা রেলওয়েকে একাধিকবার বিষয়টি জানিয়েছেন। এমনকি মাসে অন্তত ৬০টি ট্রেনের অনুরোধ জানালেও ৩০টির বেশি ট্রেন নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিন অপ্রতুল: চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম। তবে চাহিদা অনুযায়ী তিন-চারটি ইঞ্জিনও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
মামুনুল ইসলাম বলেন, ইঞ্জিনের ঘাটতির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ওয়াগনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয়ও কমেছে। অতিরিক্ত মিটারগেজ লোকোমোটিভের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন পাওয়া গেলে যাত্রী ও মালবাহী—দুই ধরনের ট্রেন পরিচালনা থেকেই আয় বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, ইঞ্জিন সংকটের কারণে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে। যাত্রীবাহী ট্রেনের নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করতে গিয়ে মালবাহী ট্রেনের জন্য পর্যাপ্ত ইঞ্জিন রাখা যাচ্ছে না। ফলে বাণিজ্যিক পরিবহনের জন্য নির্ধারিত ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বিকল্প পরিবহনে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের ব্যয়: রেলপথে পণ্য পরিবহনের নিয়মিত ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীদের সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে পণ্য আনার ক্ষেত্রে ট্রেনের অনিয়মিত চলাচল সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচের পাশাপাশি সময়ও বাড়ছে।
দীর্ঘ দূরত্বে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনে রেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস কেন্দ্রের মধ্যে নিয়মিত ট্রেন চালানো গেলে একসঙ্গে বেশি পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকে। কিন্তু লোকোমোটিভের স্বল্পতা ও সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করতে না পারায় রেলওয়ে এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।
এদিকে মালবাহী পরিবহনের আয় কমে যাওয়ায় রেলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় কমছে, অন্যদিকে কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে। ফলে ইঞ্জিন সংকট কেবল রেলের পরিচালনাগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সরবরাহব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের মালবাহী পরিবহন স্বাভাবিক করতে শুধু বিশেষ ট্রেন চালু বা সাময়িক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রেন সরবরাহের ঘাটতি কমিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি কার্যকর করতে হবে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত লোকোমোটিভের ব্যবস্থা করার কথা জানালেও কবে নাগাদ সংকট কাটবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের সরবরাহ বাড়ানো না গেলে মালবাহী পরিবহনের আয় পুনরুদ্ধার এবং কমলাপুর আইসিডির কার্যক্রম স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।




















