Dhaka ০১:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুতেরেস বিদায়ী ভাষণ দিলেন জাতিসংঘে

8 / 100 SEO Score

 

জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে সাধারণ পরিষদে শেষবারের মতো ভাষণ দিতে গিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা, জলবায়ু সংকট এবং জাতিসংঘের সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন অ্যান্তনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘও কঠিন সময় পার করছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিদায়ী ভাষণ দেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস। আগামী ৩১ ডিসেম্বর তার দ্বিতীয় মেয়াদের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। এর মধ্য দিয়ে মহাসচিব হিসেবে প্রায় এক দশকের দায়িত্বেরও ইতি ঘটবে তার।

ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ও এর ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন গুতেরেস। তার বক্তব্যের সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য এআই খাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

গুতেরেস বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর উচিত এআই-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির তথ্য পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করা। এআই পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিশ্বনেতাদের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদারকির অধীনে বহুপাক্ষিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

এআই নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক উদ্যোগের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন গুতেরেস। ২০২৩ সালে তার উদ্যোগে ৩৯ সদস্যের একটি এআই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদ যুক্ত ছিলেন। একই বছর নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মতো এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করে।

বিদায়ী ভাষণে যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন গুতেরেস। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রগতির কারণে নৌপথ হুমকির মুখে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তীব্র উত্তেজনা চলছে। সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুতেরেস বলেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

নিজের মেয়াদে যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, বিদায়ী ভাষণেও সেগুলো তুলে ধরেন গুতেরেস। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, জলবায়ু সংকটে দূষণকারীদের দায় ও ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত প্রতিনিধিরা করতালি দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানান।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অতীতের ক্ষমতার কাঠামো ও স্বার্থের বাস্তবতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা উপস্থিত থাকলেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা অংশ নেননি।

গুতেরেসের প্রায় এক দশকের নেতৃত্বে জাতিসংঘকে সংঘাত নিরসনে আরও কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এআইয়ের মতো নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই সময়ে বিভিন্ন পরাশক্তির জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে চলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল কমানোর মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়েছে সংস্থাটিকে।

এদিকে রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের চলতি সপ্তাহের বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন নতুন একটি এআই নিরাপত্তা প্রস্তাব তৈরি করেছে। এতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার বিষয়ও রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিদায়ী ভাষণের শেষ পর্যায়ে গত ১০ বছর পাশে থাকার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান গুতেরেস। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে মহাসচিবের দায়িত্বে না থাকলেও শান্তি সম্ভব— এই বিশ্বাসের পক্ষে তিনি আজীবন কাজ করে যাবেন।

জাতিসংঘ সনদের মূল মূল্যবোধের পক্ষে কাজ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়ে গুতেরেস বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি হাল ছাড়বেন না।

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

five × 1 =

About Author Information

গুতেরেস বিদায়ী ভাষণ দিলেন জাতিসংঘে

Update Time : ০৫:৩৯:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে সাধারণ পরিষদে শেষবারের মতো ভাষণ দিতে গিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা, জলবায়ু সংকট এবং জাতিসংঘের সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন অ্যান্তনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘও কঠিন সময় পার করছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিদায়ী ভাষণ দেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস। আগামী ৩১ ডিসেম্বর তার দ্বিতীয় মেয়াদের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। এর মধ্য দিয়ে মহাসচিব হিসেবে প্রায় এক দশকের দায়িত্বেরও ইতি ঘটবে তার।

ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ও এর ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন গুতেরেস। তার বক্তব্যের সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য এআই খাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

গুতেরেস বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর উচিত এআই-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির তথ্য পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করা। এআই পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিশ্বনেতাদের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদারকির অধীনে বহুপাক্ষিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

এআই নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক উদ্যোগের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন গুতেরেস। ২০২৩ সালে তার উদ্যোগে ৩৯ সদস্যের একটি এআই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদ যুক্ত ছিলেন। একই বছর নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মতো এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করে।

বিদায়ী ভাষণে যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন গুতেরেস। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রগতির কারণে নৌপথ হুমকির মুখে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তীব্র উত্তেজনা চলছে। সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুতেরেস বলেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

নিজের মেয়াদে যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, বিদায়ী ভাষণেও সেগুলো তুলে ধরেন গুতেরেস। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, জলবায়ু সংকটে দূষণকারীদের দায় ও ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত প্রতিনিধিরা করতালি দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানান।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অতীতের ক্ষমতার কাঠামো ও স্বার্থের বাস্তবতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা উপস্থিত থাকলেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা অংশ নেননি।

গুতেরেসের প্রায় এক দশকের নেতৃত্বে জাতিসংঘকে সংঘাত নিরসনে আরও কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এআইয়ের মতো নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই সময়ে বিভিন্ন পরাশক্তির জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে চলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল কমানোর মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়েছে সংস্থাটিকে।

এদিকে রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের চলতি সপ্তাহের বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন নতুন একটি এআই নিরাপত্তা প্রস্তাব তৈরি করেছে। এতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার বিষয়ও রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিদায়ী ভাষণের শেষ পর্যায়ে গত ১০ বছর পাশে থাকার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান গুতেরেস। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে মহাসচিবের দায়িত্বে না থাকলেও শান্তি সম্ভব— এই বিশ্বাসের পক্ষে তিনি আজীবন কাজ করে যাবেন।

জাতিসংঘ সনদের মূল মূল্যবোধের পক্ষে কাজ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়ে গুতেরেস বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি হাল ছাড়বেন না।