গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ধৈর্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে জানিয়ে তিনি উসকানিমূলক কর্মসূচি এড়িয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
ৱবৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সমাপনী বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও খেলাপি ঋণের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ২০০১ সালের জুনে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে জুলাই মাসে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। এরপর, দেশের জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছিল এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে বিএনপির সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছেড়ে পালানোর আগ পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অপবাদ সইতে হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক জালিয়াতির তথ্য ফাঁস করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে পতিত সরকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ১১ শতাংশ দেখিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিচালনা করা ফরেনসিক অডিটে বেরিয়ে আসে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গৃহীত নানা কার্যকর পদক্ষেপের ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অতীতের মতো বর্তমান সরকারও দেশের এই খেলাপি ঋণের কলঙ্ক দূর করতে সক্ষম হবে।
বৈদেশিক ঋণের বোঝা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশ ছেড়ে অনেকে পালিয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া ঋণের দায়ভার দেশের সাধারণ জনগণের ওপর এসে পড়েছে। এই অবস্থায়, ভঙ্গুর অর্থনীতি সত্ত্বেও বর্তমান বিএনপি সরকার বিগত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংক-বিমা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছিল। বর্তমানে দেশে একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে যেখানে বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতার সুযোগে শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি তিনি বিশেষ অনুরোধ জানান।
বক্তব্যের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর নিজস্ব বিভেদ ও বিরোধ মূলত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনর্জীবিত করার পথকে সুগম করতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধে ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে। পরিশেষে সংসদ সফলভাবে পরিচালনার জন্য স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সব সংসদ সদস্য, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সংকটময় এই মুহূর্তে বিরোধীদলের আয়োজিত লংমার্চ কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে উসকানি না দিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের পাশে থাকা উচিত। লংমার্চ দিয়ে সংকট সমাধান হলে সরকারি দল সবার আগে লংমার্চ করতো। বিরোধীদলকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি বিএনপি সরকারের অতীত সাফল্য ও সংকট জয়ের নজির তুলে ধরে দ্রুত বর্তমান পরিস্থিতি সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আজ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হতে যাচ্ছে। অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে। সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে তা তিনি দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সব সংসদ সদস্যের সদিচ্ছার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করার যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিগত ২৪-এর আন্দোলন পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন-তাদের স্বপ্ন পূরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ- এই বিশ্বাস থেকে তিনি বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প কারখানা, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দুর্নীতির পাহাড় জমেছিল, যা বিরোধীদল ও গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সবার জানা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে কোনো অজুহাত হিসেবে না দাঁড় করিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
সাম্প্রতিক সময়কার তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় সোর্স থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করেনি। এমনকি বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস আহরণ করছিল, তখন এক অদৃশ্য ইশারায় বাংলাদেশের অংশ থেকে গ্যাস কূপ খনন করা থেকে বিরত থাকা হয়, যাতে বিশেষ কোনো দেশ লাভবান হতে পারে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠন করার ১০ থেকে ১২ দিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যা তেল-গ্যাস আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, টার্মিনালটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে সংকট চরম আকার ধারণ করে।
জ্বালানি সংকটের এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিরোধীদলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধীদলের বিশাল গাড়ির লংমার্চ কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে বা জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে কোনো অপচেষ্টা চালানো সমীচীন নয়। যদি গাড়ির লংমার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হতো, তবে সরকার নিজেই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করতো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, ব্যাংকের সময় হ্রাস বা স্কুলে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার নামে কুইক রেন্টাল বসিয়ে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ও ঋণগ্রস্ত করেছিল, অথচ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও কারিগরি দুর্যোগের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে উসকানিমূলক আচরণে রূপ দিলে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া ১৪০০ শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষের ত্যাগ অবমূল্যায়িত হবে এবং পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র লাভবান হবে।
সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা এবং আশাবাদের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, এরই মধ্যে সরকার সংকট সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট দূর হবে। ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে একটি স্বাবলম্বী উৎপাদক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার বিশাল পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। অতীতের ঐতিহাসিক সাফল্যের নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই সংকট থেকে দেশকে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। তিনিই মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিশাল জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পরবর্তী ১৯৯১ সালের সরকারের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তৎকালীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ও বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যার ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিকে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ভবিষ্যৎ উপহার দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।




















