Dhaka ০৩:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চকবাজারে আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলির মনসুর খান প্লাজায় আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে ছয়তলায় থাকা দোকানের মালামাল। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে যেতে না পারায় নিজেদের গোডাউনের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কেউ গোডাউনে রাখা প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন, কেউ আবার কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন আশপাশের ব্যবসায়ীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালেও আগুন লাগা ভবনের সামনে ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের চোখেমুখে ছিল অনিশ্চয়তা, ভেতরে থাকা মালামাল ফিরে পাওয়ার আকুতি। অনেকের আশঙ্কা, আগুনে তাদের সারা জীবনের পুঁজি শেষ হয়ে গেছে।

গোডাউন মালিক মো. রবিন বলেন, আগুন লাগা ভবনটি সাততলা। ভবনের সাত, ছয় ও পাঁচতলায় কসমেটিক পণ্য ও ব্যাগের গোডাউন রয়েছে। আমাদের গোডাউন ছয়তলার ডান পাশে। আগুনও লেগেছে ছয়তলায়। ভেতরে তো যাওয়া যাচ্ছে না। গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। এখন যদি সব পুড়ে যায়, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।

তিনি বলেন, এই তিনতলায় ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটি গোডাউনে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল আছে। নিচের তলাগুলোতে ব্যাগ ও কসমেটিকের দোকান রয়েছে।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার বিষয়ে রবিন বলেন, আগুন মূলত ছয় ও সাততলায় লেগেছে। পাঁচ ও ছয়তলায় গোডাউন থাকায় এসব তলায় কেউ থাকে না। মালামাল নেওয়ার প্রয়োজন হলে সবাই এখানে আসে। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে নিচের দোকানের এক কর্মচারীর মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পাই। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ভেতরে যেতে পারিনি।

ভবনের নিচতলায় ব্যাগের দোকান রয়েছে মো. ইমতিয়াজের। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে, আর আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে এত সময় লাগল কেন, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিস মূলত দায়সারা কাজ করছে। তারা আগুন নেভাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে না।

ইমতিয়াজ বলেন, আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে, সকালে মালিক, বিকেলে ফকির। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কারণে আগুন এখন পর্যন্ত জ্বলছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, এমন সরঞ্জাম আনা হোক, যাতে উন্নত বিশ্বের মতো দ্রুত আগুন নেভানো যায়। এই ভবনে কোটি কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। আগুন যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণে না আসায় অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে গেছেন।

এদিকে আগুন লাগা ভবনের অন্যান্য গোডাউনের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় তারা এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে পারছেন না। গোডাউনে থাকা মালামাল আদৌ রক্ষা পেয়েছে কি না, তা জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। আগুন ছয় ও সাততলায় ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকায় কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ছোট কাটারা গলিতে সরেজমিনে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে রয়েছে কসমেটিকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের অসংখ্য দোকান। দোকান বন্ধ থাকায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

আগুন লাগা ভবনের পাশের একটি ভবনে কসমেটিকসের দোকান রয়েছে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেল থেকে আমাদের দোকান বন্ধ। এত দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আমরা মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা চাই, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক, যাতে আবার ব্যবসা করতে পারি।’

ভবনের দারোয়ান মো. মজিবুল্লাহ বলেন, গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে। শুধু পানি দিয়ে বিল্ডিং ভরে ফেলছে। ভেতরে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া বের হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় তারা। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করে। মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ফায়ার সার্ভিসের সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, মনসুর খান প্লাজার আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করেছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনে মার্কেটটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে। আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে তীব্র ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী। সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরের মালামাল দেখার আগপর্যন্ত তারা জানেন না, তাদের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে। কারও কয়েক দশকের ব্যবসার পুঁজি, কারও পরিবারের জীবিকার অবলম্বন সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

4 × 1 =

About Author Information

চকবাজারে আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

Update Time : ০৬:৩৯:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলির মনসুর খান প্লাজায় আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে ছয়তলায় থাকা দোকানের মালামাল। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে যেতে না পারায় নিজেদের গোডাউনের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কেউ গোডাউনে রাখা প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন, কেউ আবার কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। আগুনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন আশপাশের ব্যবসায়ীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালেও আগুন লাগা ভবনের সামনে ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের চোখেমুখে ছিল অনিশ্চয়তা, ভেতরে থাকা মালামাল ফিরে পাওয়ার আকুতি। অনেকের আশঙ্কা, আগুনে তাদের সারা জীবনের পুঁজি শেষ হয়ে গেছে।

গোডাউন মালিক মো. রবিন বলেন, আগুন লাগা ভবনটি সাততলা। ভবনের সাত, ছয় ও পাঁচতলায় কসমেটিক পণ্য ও ব্যাগের গোডাউন রয়েছে। আমাদের গোডাউন ছয়তলার ডান পাশে। আগুনও লেগেছে ছয়তলায়। ভেতরে তো যাওয়া যাচ্ছে না। গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। এখন যদি সব পুড়ে যায়, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।

তিনি বলেন, এই তিনতলায় ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটি গোডাউনে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল আছে। নিচের তলাগুলোতে ব্যাগ ও কসমেটিকের দোকান রয়েছে।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার বিষয়ে রবিন বলেন, আগুন মূলত ছয় ও সাততলায় লেগেছে। পাঁচ ও ছয়তলায় গোডাউন থাকায় এসব তলায় কেউ থাকে না। মালামাল নেওয়ার প্রয়োজন হলে সবাই এখানে আসে। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে নিচের দোকানের এক কর্মচারীর মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পাই। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ভেতরে যেতে পারিনি।

ভবনের নিচতলায় ব্যাগের দোকান রয়েছে মো. ইমতিয়াজের। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে, আর আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে এত সময় লাগল কেন, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিস মূলত দায়সারা কাজ করছে। তারা আগুন নেভাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে না।

ইমতিয়াজ বলেন, আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে, সকালে মালিক, বিকেলে ফকির। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কারণে আগুন এখন পর্যন্ত জ্বলছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, এমন সরঞ্জাম আনা হোক, যাতে উন্নত বিশ্বের মতো দ্রুত আগুন নেভানো যায়। এই ভবনে কোটি কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। আগুন যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণে না আসায় অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে গেছেন।

এদিকে আগুন লাগা ভবনের অন্যান্য গোডাউনের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় তারা এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে পারছেন না। গোডাউনে থাকা মালামাল আদৌ রক্ষা পেয়েছে কি না, তা জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। আগুন ছয় ও সাততলায় ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকায় কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ছোট কাটারা গলিতে সরেজমিনে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে রয়েছে কসমেটিকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের অসংখ্য দোকান। দোকান বন্ধ থাকায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

আগুন লাগা ভবনের পাশের একটি ভবনে কসমেটিকসের দোকান রয়েছে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেল থেকে আমাদের দোকান বন্ধ। এত দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আমরা মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা চাই, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক, যাতে আবার ব্যবসা করতে পারি।’

ভবনের দারোয়ান মো. মজিবুল্লাহ বলেন, গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে। শুধু পানি দিয়ে বিল্ডিং ভরে ফেলছে। ভেতরে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া বের হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় তারা। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করে। মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ফায়ার সার্ভিসের সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, মনসুর খান প্লাজার আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করেছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনে মার্কেটটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে। আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে তীব্র ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী। সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরের মালামাল দেখার আগপর্যন্ত তারা জানেন না, তাদের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে। কারও কয়েক দশকের ব্যবসার পুঁজি, কারও পরিবারের জীবিকার অবলম্বন সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।