ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তরুণরা
বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিন থেমে থেমে হচ্ছে বৃষ্টি। সেই সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়ছে। ফলে সারা দেশে ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। মশাবাহিত এই রোগে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শুধু সেপ্টেম্বর মাসের পাঁচ দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ১৮৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে কর্মক্ষম তরুণরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি; যার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে তাদের পরিবারে ও কর্মক্ষেত্রে।
গতকাল শনিবার দুপুরে কথা হয় রাজধানীর শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ডেঙ্গু ডেডিকেটেড (পুরুষ) ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা মারজান হাওলাদারের সঙ্গে। ২৪ বছর বয়সি এই তরুণ আশুলিয়ায় তামিম ফ্যাশন লিমিটেড নামের একটি গার্মেন্টেসে কাজ করেন। ছয় দিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত, প্রথম টেস্টে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। দ্বিতীয় বার রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কাজে যেতে পারছেন না, তার স্ত্রী রূপালী বেগমও আছেন হাসপাতালে স্বামীর সেবা করতে। তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও বমি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। জানান পরিবার ও চাকরি নিয়ে উত্কণ্ঠায় আছেন।
একই অবস্থা ২৩ বছর বয়সি তরুণ মো. জায়েদুল ইসলামের। তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ৩১ আগস্ট থেকে হাসপাতালে ভর্তি, আছেন ৪৩ নম্বর বিছানায়। থাকেন মোহাম্মদপুরে। জানান, এই কয় দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ছয় দিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের কারণে কাজে যেতে পারছেন না। ঘরে আছে স্ত্রী ও এক পুত্রসন্তান। এত টাকা কীসে ব্যয় হলো? জানতে চাইলে বলেন, হাসপাতালের দেওয়া খাবার খেতে পারি না। রক্তের সিবিসি টেস্টটা বাইরে থেকে করাতে হয়, ওষুধ কিনতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালের বিছানায় ছোট তেলাপোকার কামড়ে শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহার করা যায় না। এত অপরিষ্কার যে, যাওয়ার অবস্থা নেই।
২৯ বছর বয়সি জনি হোসেন ৩০ আগস্ট রাত থেকে জ্বরে আক্রান্ত। তিনি গাজীপুর কোনাবাড়ী এলাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ সেপ্টেম্বর রাতে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছিলেন, কিন্তু অবস্থা ভালর বদলে খারাপের দিকে যাচ্ছিল, সে কারণে চিকিৎসকরা তাকে এই হসপিটালে পাঠিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে তরুণরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবারে ও কর্মক্ষেত্রে। আক্রান্তদের বেশির ভাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১-৪০ বছর বয়সিরা। মৃত্যুর হিসেবেও এ বয়সিরা রয়েছে শীর্ষে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগী নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্যে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। দরকার মশা নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায় পর্যন্ত কাজ করা। কমিউনিটি পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষাব্যবস্থা করতে হবে। বড় বড় হাসপাতালে চিকিত্সাব্যবস্থা আছে, তবে সেটা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। রোগতত্ত্ববিদরা যে পূর্বাভাস দিচ্ছেন—তাতে ডেঙ্গু আরও বাড়তে থাকবে বলে জানান এই জনস্বাস্থ্যবিদ। তিনি বলেন, প্রতি চার বছর পরপর ডেঙ্গুর মহামারি ঘটে, ২০২৩ সালে সর্বশেষ হয়েছে। এ বছরের শেষের দিকে সেটা হতে পারে। কাজেই আমরা যদি মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগী ব্যবস্থাপনার পলিসি না বদলাই তাহলে খুব একটা ডেঙ্গু পরিস্থিতি উন্নত হবে না।
শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা ট্রেইনি চিকিৎসক জাহেদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, এখন মানুষ অনেকটা সচেতন হয়েছে। কেউ কেউ জ্বর শুরুর পরেই হাসপাতালে আসছেন, বাসায় থাকতে চান না, খারাপ কিছু হওয়ার ভয়ে। অনেকে আবার কিছুটা জটিলতা শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে আসছে। দুই ধরনের কেসই আছে। আমরা রোগীদের বলি জ্বর এলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ খাওয়া যাবে না।
তরুণদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি এবং মৃত্যু বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে—চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১ থেকে ৩৫ এবং ২৬-৩০ বছর বয়সি তরুণরা। এর মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বয়সিরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। যার মোট সংখ্যা এ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৬৮ জনে। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৮১৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া, ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সি আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ২৬ জন। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু আক্রান্তের সংখ্যায় নয়, মৃত্যুও সর্বোচ্চ মৃত্যু ২৬-৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে ১৬ জন। ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে ৩৬-৪০ বছর বয়সিদের মধ্যে। এরপরের অবস্থানে আছেন ৪৬-৫০ বছর বয়সিদের মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের একটি বড় অংশই তরুণ। যারা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার কারণে পরিবার ও কর্মক্ষেত্র দুই জায়গায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি : সারা দেশে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরো ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৮৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে মোট ১১৩ জনের, আর হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৩২ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব তথ্য জানিয়েছে।
ডেঙ্গুবিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১০২ জন, দক্ষিণ সিটিতে ১৪৯ জন ভর্তি হন। দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৭৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এছাড়া, বরিশাল বিভাগে ১৭১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২৩ জন, খুলনায় ১৬৩ জন ও ময়মনসিংহে ৫০ জন, রাজশাহীতে ৪৯ জন এবং রংপুরে ৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখতে শুরু করে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ঐ বছর রেকর্ড সংখ্যক রোগীর মৃত্যু হয়, ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কিছুটা কমে সারা দেশে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। এর মধ্যে ৪২৩ জনের মৃত্যু হয়।

















