মানবতাবিরোধী অপরাধ: দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা বিভিন্ন মামলার রায় ঘোষণা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। পৃথক দুটি ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত একাধিক মামলায় আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার বেশ কয়েকজন আসামি পলাতক রয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি আদালতে আরও বেশ কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারকাজ চলমান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি কোনো কোনো আসামির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ের আলোকে আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তবে রায় ঘোষণার পর আপিলের সুযোগ থাকা অবস্থায় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা যাবে কি না, সম্পদ জব্দ ও মূল্যায়ন করবে কোন কর্তৃপক্ষ, তা কীভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে আইনি বাধা নেই বলে মনে করেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিন জনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
আসামিদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে পৃথক দুটি রায়ে।
৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের ৫০ শতাংশ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে রায়ে।
সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া কী
এখন প্রশ্ন হলো, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় কোন কর্তৃপক্ষ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে? সম্পত্তির মূল্যায়ন কীভাবে হবে, কোন প্রক্রিয়ায় তা বিক্রি বা হস্তান্তর করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কীভাবে অর্থ বণ্টন করা হবে—এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন ও কার্যবিধিতে বিস্তারিত বাস্তবায়ন-পদ্ধতি কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায়ে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ১১(৯) ধারায় ট্রাইব্যুনালকে আসামির সম্পদ ফ্রিজ (স্থগিত) বা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পলাতক হওয়া ঠেকানো, ২০-এ ধারার অধীনে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ৫ আসামির ৫০ শতাংশ সম্পত্তি পাবে জুলাই শহীদের পরিবার
আইনের ২০-এ ধারায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির বর্তমান সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তার অর্জিত সম্পদ থেকেও তা আদায় করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবি ওই সম্পদের ওপর অন্য যেকোনো দাবির চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে।
সম্পদ বাজেয়াপ্ত নিয়ে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ
আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া ও রায় বাস্তবায়নের জটিলতা কাটাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের কাছে তারা জানতে চেয়েছেন, আসামিদের সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তা কীভাবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
গত ১৩ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামিদের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কী প্রক্রিয়ায় ও কতটুকু বণ্টন হবে, তা স্পষ্ট করার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধিতে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই। ফলে দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায় কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে জটিলতা রয়েছে।




















