নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে
সরকারের ২৫ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
◆ নদীর প্রবাহ কমায় দক্ষিণে বাড়ছে লবণাক্ততা
◆ নিরাপদ পানির পাশাপাশি পানির মান নিশ্চিতের উদ্যোগ
◆ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ
অঞ্চলভেদে পানির সংকট মোকাবিলায় আলাদা পরিকল্পনা
দেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে নিরাপদ ও সুপেয় পানি পৌঁছে দিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। নিরাপদ পানির সংকট, নদ-নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতার বৈষম্য সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
১৮ কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তায় বড় উদ্যোগ: ড. আবদুল মঈন খান বলেন, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের কাছে কীভাবে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটিই বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। পানি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও দূষিত ও জীবাণুযুক্ত পানি মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তার ভাষায়, পানি একদিকে জীবনের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে দূষিত পানি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই শুধু পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই নয়, সেই পানি নিরাপদ কি না সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানির সংকটকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলে পানির সংকট এবং নদ-নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলোকে প্রকল্পের আওতায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পে ব্যয় হতে পারে ২৫ হাজার কোটি টাকা: নিরাপদ পানি নিশ্চিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জানান, বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীকে সমন্বয় করে প্রকল্পটির আকার প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
তবে এটি শুধু ইউনিসেফের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে না। বৈঠকে ইউনিসেফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও ওয়াটারএইডের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অংশীদারদের সমন্বয়ে প্রকল্পটির অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
নদীতে পানি কমছে, বাড়ছে সংকট: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও নদ-নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট ক্রমেই জটিল হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, দেশের নদীগুলোতে প্রচুর পানি থাকলেও অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে দেশের ভেতরে নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে উত্তর ও দক্ষিণ দুই অঞ্চলেই। উত্তরাঞ্চলে পানির স্বল্পতার কারণে মরুকরণ বা ডেজার্টিফিকেশনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উজানের দিকে উঠে আসছে।
ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের বহু মানুষ খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছেন।
লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণাঞ্চলে: নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্ব পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। এতে নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানির উৎস সীমিত হয়ে যায়।
সরকারের প্রস্তাবিত সমন্বিত প্রকল্পে এ ধরনের আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে পানির উৎস সংরক্ষণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
দাতাদের সহায়তা কমছে: নিরাপদ পানি প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে আসছে। তবে অতীতে পাওয়া সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণও কমে আসছে বলে জানান তিনি। বিশ্বের ধনী দেশগুলো নিজেরাই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকায় উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সহায়তার পরিমাণ কমছে। ফলে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরাপদ পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে বড় পরিসরের এই উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু পানি সরবরাহ নয়, নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে: বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে শুধু নতুন পানির উৎস তৈরি করলেই হবে না; পানির গুণগত মান, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে, সেখানে বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পরিকল্পিত প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারির ওপর।
দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার এখন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির পথে এগোচ্ছে। ফলে প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় এটি দেশের অন্যতম বড় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।




















