স্যামসন এইচ চৌধুরী: ছোট ফার্মেসি থেকে শিল্প সাম্রাজ্য গড়ার অনুপ্রেরণার গল্প
বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের কিংবদন্তি উদ্যোক্তা স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন এমন এক দূরদর্শী ব্যবসায়ী, যাঁর উদ্যোক্তা জীবন শুরু হয়েছিল অত্যন্ত ছোট পরিসরে। কঠোর পরিশ্রম, দূরদর্শিতা, সততা ও ব্যবসায়িক শৃঙ্খলার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ।
স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দেন এবং বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্প খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শৈশব থেকেই ওষুধ ও চিকিৎসাসেবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। তাঁর বাবা ছিলেন একটি আউটডোর ডিসপেনসারির মেডিকেল অফিসার। বাবার পেশার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ওষুধ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
ভারতে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং পাবনার আতাইকুলা গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ব্যবসা হিসেবে ফার্মেসিকে বেছে নেন। গ্রামের বাজারে একটি ছোট ওষুধের দোকান দিয়ে শুরু হয় তাঁর উদ্যোক্তা জীবন।
তবে তাঁর ব্যবসায়িক পথ মোটেও সহজ ছিল না। সীমিত পুঁজি ও সীমিত সুযোগের মধ্যেও তিনি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ওষুধ কারখানা স্থাপনের লাইসেন্স লাভ করেন।
এরপর আরও তিন বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রত্যেকে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে পাবনায় একটি ওষুধ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। চার বন্ধুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নাম দেওয়া হয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। চারকোণা আকৃতির লোগোটিও সেই চার উদ্যোক্তার অংশীদারত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়।
পাবনার সেই ছোট কারখানা থেকেই ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় স্কয়ারের ব্যবসা। স্যামসন এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ওষুধ শিল্পের পাশাপাশি স্কয়ারের ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় প্রসাধনসামগ্রী, টেক্সটাইল, পোশাক, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও মিডিয়াসহ বিভিন্ন খাতে।
তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে স্কয়ার শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। কয়েক দশকের ধারাবাহিক বিকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি করদাতা হিসেবেও স্কয়ারের অবদান স্বীকৃত হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্বাচনে স্কয়ার গ্রুপ দেশের অন্যতম সেরা করদাতা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল বড় সাফল্যের জন্য সবসময় বড় পুঁজি দিয়ে শুরু করতে হয় না। বরং সঠিক পরিকল্পনা, সততা, পরিশ্রম, মানসম্পন্ন পণ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা একটি ছোট উদ্যোগকেও বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক দর্শন ও উদ্যোক্তা-চেতনা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজে এখনও অনুপ্রেরণার উৎস।
একটি গ্রামের ছোট ফার্মেসি থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার এই দীর্ঘ যাত্রা স্যামসন এইচ চৌধুরীকে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁর জীবন দেখিয়েছে, প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শিতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।




















