Dhaka ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: গ্রেপ্তারের আগে ফেসবুকে যে আক্ষেপের কথা লিখেছিলেন নজরুল ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম মণ্ডপ পরিদর্শনে সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী আর্জেন্টিনার কাছে হার: রেফারির সমালোচনা করায় মিশরের কোচসহ তিনজন নিষিদ্ধ ইসরায়েলে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ করবে মুসলিম ভোটাররা টুপটুপ কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলায় প্রাণ হারায় ১০ পর্যটক : পুলিশ ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ওঠার সমীকরণ, কী করতে হবে বাংলাদেশকে আসামে দুই দিনে উচ্ছেদ ১১০০ বাঙালি মুসলিম পরিবার, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১০টি মসজিদ নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪

নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসে সরকারের বড় উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

***২০–২৫ হাজার টাকা আয় হলেই মিলবে ফ্ল্যাটের যোগ্যতা
***ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দে মাসে দিতে হবে সাড়ে ৭ হাজার টাকা
***ভাড়ার ৬০ শতাংশ রাখবে রাজউক, ৪০ শতাংশ ব্যবস্থাপনায়
***চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রকল্পে আসছে একাধিক সংশোধন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ব্যয়বহুল আবাসন বাজারে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ায় ফ্ল্যাট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে গাড়িচালক, গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মতো সেবা খাতে নিয়োজিত মানুষের জন্য তৈরি হবে আধুনিক আবাসন। প্রস্তাব অনুযায়ী, যাদের পারিবারিক মাসিক আয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে, তারা মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় এসব ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাবেন।

‘উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে সোশ্যাল হাউজিং নির্মাণ’ নামের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। চলতি সময় থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রকল্পের ডিপিপি এখনো অনুমোদন হয়নি।

৫৯২ ফ্ল্যাটে ঠাঁই হবে নিম্ন আয়ের মানুষের: রাজউকের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় ছয়তলা বিশিষ্ট ছয়টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব ভবনে মোট ৫৯২টি ফ্ল্যাট থাকবে। এর মধ্যে ৬০০ বর্গফুটের ৩০৮টি এবং ৪০০ বর্গফুটের ২৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা রয়েছে।

ফ্ল্যাটগুলো মালিকানার ভিত্তিতে নয়, ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় কোম্পানি নিয়োগের মাধ্যমে ফ্ল্যাটগুলোর ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের উত্তরা এলাকার সার্ভিস প্রোভাইডার হতে হবে। অর্থাৎ যেসব নিম্ন আয়ের মানুষকে লক্ষ্য করে আবাসনটি তৈরি করা হবে, তাদের কর্মসংস্থান বা সেবা প্রদানের সঙ্গে উত্তরার সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে।

প্রস্তাবিত আবাসিক ভবনের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় ছয়তলা একটি মসজিদ ভবন, একটি পার্ক, তিনটি খেলার মাঠ, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ফুটপাত রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি আবাসিক ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থাও থাকবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাণিজ্যিক ভবন। বেজমেন্টসহ ১২ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এর মোট আয়তন হবে ৩ লাখ ৭০ হাজার ১৬০ বর্গফুট। এ ভবন থেকে পাওয়া আয় আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ এবং প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ভাড়ার ৪০ শতাংশ ব্যবস্থাপনায়, ৬০ শতাংশ রাজউকের: সাশ্রয়ী ভাড়ায় ফ্ল্যাট দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা আর্থিক কাঠামোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। প্রস্তাব অনুযায়ী, ফ্ল্যাট থেকে সংগৃহীত ভাড়ার ৪০ শতাংশ তৃতীয় পক্ষ ব্যবস্থাপনা ফি হিসেবে পাবে। আর বাকি ৬০ শতাংশ রাজউকের কাছে সংরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির কাজে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে।

রাজউকের কর্মকর্তাদের মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শুধু ফ্ল্যাট নির্মাণ করলেই আবাসন সমস্যা সমাধান হবে না। ভবন, রাস্তা, নিরাপত্তা, খেলার জায়গা, ধর্মীয় স্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। এ কারণেই ভাড়া থেকে একটি অংশ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে পুরো প্রকল্পের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন-৬) শেখ মো. গোলাম রাব্বী জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্টদের উত্তরা এলাকার সার্ভিস প্রোভাইডার হতে হবে এবং তারা সাড়ে ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় ফ্ল্যাটে থাকতে পারবেন। তবে ডিপিপি অনুমোদনের আগে প্রকল্পের কিছু বিষয় সংশোধন করা হবে।

৮২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন: নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের লক্ষ্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে যাদের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে, তাদের প্রকৃত আয়, পরিবারের আকার, আবাসনের চাহিদা এবং ফ্ল্যাটের উপযোগিতা নিয়ে আরও বিস্তারিত সমীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মাসিক আয়ের জনগোষ্ঠীকে প্রকল্পের প্রধান উপকারভোগী হিসেবে ধরা হলেও এর বাইরে থাকা অন্যান্য নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে কমিশন উল্লেখ করেছে।

৪০০ ও ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা বড় হলে এসব আয়তনের ফ্ল্যাট তাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, ভবিষ্যতে তারা সেখানে থাকতে আগ্রহী থাকবেন কি না এসব বিষয় যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উত্তরার মতো মূল্যবান এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমির বাজারমূল্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের জমির প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় সরকার কতটা ভর্তুকি দিচ্ছে, তার বস্তুনিষ্ঠ হিসাব চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের মিশ্র ব্যবহারের মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।

কমিশন আরও বলেছে, শুধু একটি নির্দিষ্ট সেক্টরে নিম্ন আয়ের কর্মীদের আবাসন দেওয়াই একমাত্র সমাধান কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে উত্তরার কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত কম দামের জমিতে আবাসন তৈরি করে পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে তাদের কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিশ্লেষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন দিলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ৮২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে এ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রভাব কতটা বাস্তবসম্মত এবং কীভাবে তা হিসাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়েছে কমিশন।

এদিকে ভবনের উচ্চতা ছয়তলার মধ্যে রাখার পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছে রাজউক। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর মতে, ভবনের উচ্চতা বাড়লে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি লিফট, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সাশ্রয়ী আবাসনের উদ্দেশ্য বিবেচনায় ভবনের উচ্চতা সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের দৃষ্টিতে উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জমির সর্বোত্তম ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শুধু নির্মাণ ব্যয় কম রাখার জন্য ছয়তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটিও পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) নেয়ামত উল্যা ভূইঁয়া জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের লক্ষ্যটি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে তথ্যের ঘাটতি, অসামঞ্জস্য ও উপস্থাপনাগত ত্রুটি রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাট বরাদ্দের নীতিমালাও আরও পূর্ণাঙ্গ করার প্রয়োজন রয়েছে।

ফলে উত্তরায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাড়ে ৭ হাজার টাকার ফ্ল্যাটের উদ্যোগটি বাস্তবায়নের আগে উপকারভোগী নির্বাচন, ফ্ল্যাটের আয়তন, জমির ব্যবহার, নির্মাণব্যয়, ভর্তুকি, ব্যবস্থাপনা এবং যাতায়াত সব দিক নতুন করে বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কী কাঠামোয় বাস্তব রূপ পাবে, তা নির্ভর করছে পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ এবং সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর।

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

one × 2 =

About Author Information

নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসে সরকারের বড় উদ্যোগ

Update Time : ০৮:৪৭:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

***২০–২৫ হাজার টাকা আয় হলেই মিলবে ফ্ল্যাটের যোগ্যতা
***ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দে মাসে দিতে হবে সাড়ে ৭ হাজার টাকা
***ভাড়ার ৬০ শতাংশ রাখবে রাজউক, ৪০ শতাংশ ব্যবস্থাপনায়
***চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রকল্পে আসছে একাধিক সংশোধন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ব্যয়বহুল আবাসন বাজারে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ায় ফ্ল্যাট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে গাড়িচালক, গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মতো সেবা খাতে নিয়োজিত মানুষের জন্য তৈরি হবে আধুনিক আবাসন। প্রস্তাব অনুযায়ী, যাদের পারিবারিক মাসিক আয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে, তারা মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় এসব ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাবেন।

‘উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে সোশ্যাল হাউজিং নির্মাণ’ নামের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। চলতি সময় থেকে ২০৩১ সাল মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রকল্পের ডিপিপি এখনো অনুমোদন হয়নি।

৫৯২ ফ্ল্যাটে ঠাঁই হবে নিম্ন আয়ের মানুষের: রাজউকের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় ছয়তলা বিশিষ্ট ছয়টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব ভবনে মোট ৫৯২টি ফ্ল্যাট থাকবে। এর মধ্যে ৬০০ বর্গফুটের ৩০৮টি এবং ৪০০ বর্গফুটের ২৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা রয়েছে।

ফ্ল্যাটগুলো মালিকানার ভিত্তিতে নয়, ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় কোম্পানি নিয়োগের মাধ্যমে ফ্ল্যাটগুলোর ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের উত্তরা এলাকার সার্ভিস প্রোভাইডার হতে হবে। অর্থাৎ যেসব নিম্ন আয়ের মানুষকে লক্ষ্য করে আবাসনটি তৈরি করা হবে, তাদের কর্মসংস্থান বা সেবা প্রদানের সঙ্গে উত্তরার সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে।

প্রস্তাবিত আবাসিক ভবনের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় ছয়তলা একটি মসজিদ ভবন, একটি পার্ক, তিনটি খেলার মাঠ, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ফুটপাত রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি আবাসিক ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থাও থাকবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাণিজ্যিক ভবন। বেজমেন্টসহ ১২ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এর মোট আয়তন হবে ৩ লাখ ৭০ হাজার ১৬০ বর্গফুট। এ ভবন থেকে পাওয়া আয় আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ এবং প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ভাড়ার ৪০ শতাংশ ব্যবস্থাপনায়, ৬০ শতাংশ রাজউকের: সাশ্রয়ী ভাড়ায় ফ্ল্যাট দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা আর্থিক কাঠামোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। প্রস্তাব অনুযায়ী, ফ্ল্যাট থেকে সংগৃহীত ভাড়ার ৪০ শতাংশ তৃতীয় পক্ষ ব্যবস্থাপনা ফি হিসেবে পাবে। আর বাকি ৬০ শতাংশ রাজউকের কাছে সংরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির কাজে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে।

রাজউকের কর্মকর্তাদের মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শুধু ফ্ল্যাট নির্মাণ করলেই আবাসন সমস্যা সমাধান হবে না। ভবন, রাস্তা, নিরাপত্তা, খেলার জায়গা, ধর্মীয় স্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। এ কারণেই ভাড়া থেকে একটি অংশ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে পুরো প্রকল্পের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন-৬) শেখ মো. গোলাম রাব্বী জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্টদের উত্তরা এলাকার সার্ভিস প্রোভাইডার হতে হবে এবং তারা সাড়ে ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় ফ্ল্যাটে থাকতে পারবেন। তবে ডিপিপি অনুমোদনের আগে প্রকল্পের কিছু বিষয় সংশোধন করা হবে।

৮২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন: নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের লক্ষ্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে যাদের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে, তাদের প্রকৃত আয়, পরিবারের আকার, আবাসনের চাহিদা এবং ফ্ল্যাটের উপযোগিতা নিয়ে আরও বিস্তারিত সমীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মাসিক আয়ের জনগোষ্ঠীকে প্রকল্পের প্রধান উপকারভোগী হিসেবে ধরা হলেও এর বাইরে থাকা অন্যান্য নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে কমিশন উল্লেখ করেছে।

৪০০ ও ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা বড় হলে এসব আয়তনের ফ্ল্যাট তাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, ভবিষ্যতে তারা সেখানে থাকতে আগ্রহী থাকবেন কি না এসব বিষয় যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উত্তরার মতো মূল্যবান এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমির বাজারমূল্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের জমির প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় সরকার কতটা ভর্তুকি দিচ্ছে, তার বস্তুনিষ্ঠ হিসাব চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের মিশ্র ব্যবহারের মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।

কমিশন আরও বলেছে, শুধু একটি নির্দিষ্ট সেক্টরে নিম্ন আয়ের কর্মীদের আবাসন দেওয়াই একমাত্র সমাধান কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে উত্তরার কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত কম দামের জমিতে আবাসন তৈরি করে পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে তাদের কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিশ্লেষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন দিলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ৮২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে এ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রভাব কতটা বাস্তবসম্মত এবং কীভাবে তা হিসাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়েছে কমিশন।

এদিকে ভবনের উচ্চতা ছয়তলার মধ্যে রাখার পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছে রাজউক। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর মতে, ভবনের উচ্চতা বাড়লে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি লিফট, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সাশ্রয়ী আবাসনের উদ্দেশ্য বিবেচনায় ভবনের উচ্চতা সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের দৃষ্টিতে উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জমির সর্বোত্তম ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শুধু নির্মাণ ব্যয় কম রাখার জন্য ছয়তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটিও পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) নেয়ামত উল্যা ভূইঁয়া জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের লক্ষ্যটি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে তথ্যের ঘাটতি, অসামঞ্জস্য ও উপস্থাপনাগত ত্রুটি রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাট বরাদ্দের নীতিমালাও আরও পূর্ণাঙ্গ করার প্রয়োজন রয়েছে।

ফলে উত্তরায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাড়ে ৭ হাজার টাকার ফ্ল্যাটের উদ্যোগটি বাস্তবায়নের আগে উপকারভোগী নির্বাচন, ফ্ল্যাটের আয়তন, জমির ব্যবহার, নির্মাণব্যয়, ভর্তুকি, ব্যবস্থাপনা এবং যাতায়াত সব দিক নতুন করে বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কী কাঠামোয় বাস্তব রূপ পাবে, তা নির্ভর করছে পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ এবং সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর।