কন্যাশিশুর মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হোক সমাজ
একটি সুন্দর, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার প্রথম শর্ত হলো প্রতিটি শিশুর মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা। ছেলে কিংবা মেয়ে,প্রতিটি শিশুই সমান ভালোবাসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সম্মানের অধিকারী।কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনা ও শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক। বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশু সম্মান, স্বাধীনতা ও সমান সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
সমাজের নানা স্তরে এখনো কন্যাশিশুরা লিঙ্গবৈষম্য, অবহেলা, বাল্যবিবাহ, শিক্ষাবঞ্চনা ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশুর স্বপ্ন ও মতামতকে উপেক্ষা করে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হয়, যা তার স্বাভাবিক বিকাশ ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। তার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রতিবছর ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক কন্যাশিশুর জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তার মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো কন্যাশিশুকে মেয়ে হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়তে হবে না।
কন্যাশিশুর অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়।এই দিবসের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় কন্যাশিশুদের সামনে থাকা বিভিন্ন বাধা, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগের প্রতি। কন্যাশিশুরা যেন নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে এবং সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বও তুলে ধরা হয়। দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের উপলক্ষ নয়; বরং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান বৈষম্য চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্মগত অধিকার রয়েছে নিরাপদে বেঁচে থাকা, পুষ্টিকর খাবার পাওয়া, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, শিক্ষা অর্জন, মতামত প্রকাশ এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার। এসব অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এগুলো তার মানবিক মর্যাদা ও স্বাভাবিক বিকাশের অপরিহার্য শর্ত।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, বৈষম্যহীনতা, জীবন ও বিকাশ এবং শিশুর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে কন্যাশিশুকে পরিবারের সিদ্ধান্তে অপ্রাসঙ্গিক মনে করা যাবে না। তার বয়স, পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী মতামত শোনা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসকে অর্থবহ করতে হলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন।
জন্মের পর থেকেই ছেলে ও মেয়ের প্রতি সমান মর্যাদা, ভালোবাসা ও যত্ন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, নির্যাতন, হয়রানি ও সব ধরনের শোষণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিশুদের মতামত প্রকাশ, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক কন্যাশিশুর বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
কন্যাশিশুর অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত ও শিশুবান্ধব সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।এই অঙ্গীকারগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং দৈনন্দিন আচরণ, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। কন্যাশিশুকে অবহেলা করে কোনো সমাজ টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে একটি মানবিক, দক্ষ ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা।


























