আজ মীনা দিবস
মীনা চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও সবার প্রিয় চরিত্র হচ্ছে মীনা। মীনা সবসময় চায় পরিবেশকে রক্ষা করতে। পরিবেশের সুন্দরের মাঝে সে নিজেকে সুন্দর দেখে।
৭০ লাখ মানুষ বাসকারী চট্টগ্রামে রয়েছে ২৮টি কার্যকর পাবলিক টয়লেট। যেখানে প্রয়োজন ছিল ৩৮০টি। আবার বরিশালে প্রয়োজন ছিল ৩০টি পাবলিক টয়লেট, সেখানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ২টি। রাজশাহীতে ৬০টি পাবলিক টয়লেটের চাহিদার বিপরীতে রয়েছে মাত্র ১৪টি।
ধরে নেয়া যাক, আপনি একটা জাদুর কুপি পেয়েছেন। কুপি থেকে বেরিয়ে এলো এক দৈত্য। তারপর সে আপনার তিনটা ইচ্ছা জানতে চাইলো? তখন সেই দৈত্যের কাছে আপনি কী কী চাইবেন?
আরব্য রজনীর এই বিখ্যাত গল্পের থিমে মীনা কার্টুনের একটি পর্ব তৈরি হয়েছিল। সেই পর্বে মীনা এক জাদুর কুপি পেয়েছিল। আর ইচ্ছাপূরণ-দৈত্যের কাছে সে চেয়েছিল কী?
না, মীনা কিন্তু সোনা-রূপা কিছুই চায়নি। তার প্রথম ইচ্ছা ছিল স্যানিটারি পায়খানা। ছেলেবেলায় দেখা মীনার সেই পর্বটি আজ মীনা দিবসে স্মরণ করে মনে হয়, আমরাও পায়খানাই চাই। একথা উঠলে মনে হতে পারে, এখন তো বিষয়টি প্রাসঙ্গিক না; স্যানিটারি ল্যাট্রিনের অভাব নেই। কিন্তু তারপরও সেটাই প্রয়োজন। কারণ, ল্যাট্রিন থাকা আর ‘পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট’ থাকা এক বিষয় নয়।
প্রতিদিন রাস্তায় বের হলে আমরা দেখি অসংখ্য মানুষ সড়কের পাশে, গাছে গোড়ায়, কোনো উন্মুক্ত স্থানে মূত্রত্যাগ করে। এটা কী কেবল স্বভাবদোষ নাকি তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহার উপযোগী পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই?
আবার একটি পরিস্থিতি ভাবা যাক। কেউ একজন শপিংয়ের জন্য বাসা থেকে বের হয়েছেন। কেনাকাটা করার সময় তার প্রস্রাব বা পায়খানার চাপ এলো। তখন যদি সেই ব্যক্তির আশেপাশে কোনো পাবলিক টয়লেট থাকে তাহলে তিনি সেখানে যাবেন। কিন্তু যদি না থাকে তাহলে প্রাকৃতিক কর্মটি করার সুযোগ নেই। আবার যদি টয়লেট থাকে কিন্তু সেটি অপরিছন্ন, দুর্গন্ধযুক্ত হয় এবং সেটা ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় তাহলে কী কেউ সেখানে যেতে চাইবেন? বেশিরভাগ মানুষ হয়ত যেতে চাইবে না। কিংবা বিকল্প উপায় না থাকায় সেটিই ব্যবহার করতে হবে।
আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। প্রতিদিন রাস্তায় বের হলে আমরা দেখি অসংখ্য মানুষ সড়কের পাশে, গাছে গোড়ায়, কোনো উন্মুক্ত স্থানে মূত্রত্যাগ করে। এটা কী কেবল স্বভাবদোষ নাকি তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহার উপযোগী পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই?
রাজধানীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট এলাকা শাহবাগ। সেখানে দুটি বড় হাসপাতাল রয়েছে। আর এ এলাকার ঐতিহ্য হয়ে আছে ফুলের দোকানগুলো। প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ এ এলাকায় আনাগোনা করেন। কিন্তু স্থানটির নিকটতম স্থানে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। তাহলে শৌচকর্মের প্রয়োজনে তারা কোথায় যান?
এমন প্রশ্নের উত্তরে একজন জানান, তিনি শাহবাগ থানার টয়লেট ব্যবহার করেন। কিন্তু সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। পরিচিত পুরুষ দোকানিরাই কেবল সেখানে যেতে পারেন। তাহলে সেখানকার নারীরা কোথায় যান? ক্রেতারা কোথায় যান? তারা হাসপাতালগুলোর টয়লেটে, যেখানে যেতে তাদের দুইটি ব্যস্ততম সড়ক প্রতিনিয়ত পার হতে হয়।
কিন্তু পুরো ঢাকা শহরে মোট কত মানুষ বাস করেন ও প্রতিনিয়ত যাতায়াত করেন তা কি সবার জানা?
বেসরকারি সংস্থা ওয়াটার এইডের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বসবাসরত ও বহিরাগত মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিদিন বাড়ির বাইরে বের হন। কিন্তু তাদের প্রস্রাব-পায়খানার জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট নেই।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্য মতে, ঢাকায় প্রতিদিন দেড় লাখ পথচারী যাতায়াত করেন। তাদের ব্যবহারের জন্য রয়েছে কেবল ১৩১টি স্থায়ী ও ১৭টি ভ্রাম্যমান টয়লেট। অথচ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দেড় লাখ পথচারীর জন্য প্রয়োজন ছিল দেড় হাজার টয়লেট। বিশ্ব মান অনুযায়ী প্রতি দশ হাজার পথচারীরর জন্য ১০ ইউনিটসম্পন্ন একটি পাবলিক টয়লেট প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, কেবল ঢাকায় পাবলিক টয়লেটের পরিস্থিতিই কী এমন? না। পুরো দেশের বড় বড় শহরগুলোর চিত্রই এমন। ৭০ লাখ মানুষ বাসকারী চট্টগ্রামে রয়েছে ২৮টি কার্যকর পাবলিক টয়লেট। যেখানে প্রয়োজন ছিল ৩৮০টি। আবার বরিশালে প্রয়োজন ছিল ৩০টি পাবলিক টয়লেট, সেখানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ২টি। রাজশাহীতে ৬০টি পাবলিক টয়লেটের চাহিদার বিপরীতে রয়েছে মাত্র ১৪টি।
প্রথমত, চাহিদা অনুসারে পাবলিক টয়লেট নেই। আর যা আছে তার বেশিরভাগই অপরিছন্ন থাকে। অনেকগুলো ব্যবহার উপযোগী থাকে না বা সংস্কার কাজ চলছে। আবার অনেকগুলোর কাঠামো থাকলেও পরিত্যাক্ত বা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। কেবল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মোট ৭০টি পাবলিক টয়লেটের মধ্যে পরিত্যক্ত, নির্মাণাধীন, সংস্কারাধীন ও বন্ধ রয়েছে ১৯টি বলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে। কিন্তু যেগুলো ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে সেগুলোও নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য খুব বেশি উপযুক্ত নয়। যেমন রাজধানীর অন্যতম বড় মার্কেট ঢাকা নিউ সুপার নিউমার্কেট। সেখানে বিভিন্ন ব্লকে বেশ কয়েকটি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় নারীদের টয়লেট ব্যবহার করতে শেষ মাথায় যেতে হয়, যার একপাশে রয়েছে পুরুষদের জন্য উন্মুক্ত ইউরিনাল। অন্যপাশে পুরুষদের জন্য টয়লেট। ফলে নারীদের জন্য সেখানকার পাবলিক টয়লেটে যাওয়া অস্বস্তিকরই বটে। কেবল এ বাজার এলাকার নয়, পুরো দেশে মানসম্মত টয়লেটের অভাব প্রকট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা। এর বাইরে বিভিন্ন অফিস, শপিং মল ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানের টয়লেটের ব্যবস্থাপনাও ভালো নয়। এছাড়া এগুলো সবাইকে ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। বিশেষত ঢাকায় অসংখ্য মসজিদে টয়লেট থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে মুসল্লি ব্যতীত তা ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া তালাবদ্ধই থাকে।
স্যানিটারি টয়লেট পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে আরো একটি পরসংখ্যানের দারস্থ হওয়া যাক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের ৫৫ শতাংশের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুরা নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
মীনার দ্বিতীয় ইচ্ছা কিন্তু ছিল নিরাপদ পানি ও তৃতীয় ইচ্ছা ছিল ভালো মতো হাত ধোয়া। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এর মানে হলো দেশে এখন পর্যন্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের অভাব রয়েছে। সুতরাং আমাদের এখনো পায়খানাই চাইতে হবে। সঙ্গে নিরাপদ পানিও।
স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বছর জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতিমালা ২০২৬ জারি করেছে। তাতে পাবলিক টয়লেটের শ্রেণীবিন্যাসের একটি সারসংক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে যানবাহন চলাচল স্থান তথা ট্রানজিট, প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা, জনসমাগম স্থান, নিম্ম আয়ের কমিউনিটি, অনুষ্ঠানভিত্তিক, জরুরি অবস্থায় ব্যবহৃত পাবলিক টয়লেটের রূপরেখা রয়েছে। সরকার যদি এসব স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাবলিক টয়লেট নিশ্চিত করতে পারে তাহলে হয়ত দেশের পাবলিক টয়লেট পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নত হবে। তবে টয়লেট অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে।
পাবলিক টয়লেট স্বাস্থ্যসম্মত না হলে মলমূত্রবাহিত রোগ, যেমন টাইফয়েড, কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, হেপাটাইটিস এ, কৃমি ইত্যাদি হতে পারে। টয়লেটের প্যান, কমোডে বসার স্থান, পানির কল, টয়লেট শাওয়ার, বদনা, দরজার লক বা ছিটকিনি, টয়লেটের মেঝে ও দেয়াল—সব জায়গায়ই এসব রোগের জীবাণু থাকতে পারে। এমনকি হতে পারে নানা ধরনের চর্মরোগও। কারণ, একই জায়গায় বহু মানুষের ত্বকের স্পর্শ লাগে। সুতরাং পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।


























