Dhaka ১১:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক দশকে ১৫শ নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন তেঁতুলিয়ার লিলি

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি এখন গর্ভবতী মায়েদের ভরসার ঠিকানা। এর পেছনে রয়েছেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি। গত এক দশকে তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রসূতির নরমাল ডেরিভারি করিয়ে এলাকায় অনন্য আস্থা অর্জন করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকের একটি কক্ষে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন লিলি। শিশুদের নিয়ে এসেছেন অনেক মা। গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়া, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ সবই চলছে একসঙ্গে।

১৯৯৮ সালে স্থানীয় বাসিন্দা রমিনা খাতুনের দেওয়া জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক। ক্লিনিকটি থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। দূরত্ব ও যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে প্রসবব্যথা উঠলেই এখন অনেক পরিবার ছুটে আসে এই ক্লিনিকে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন মেহেরুন নেহার লিলি। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ছয় মাসের কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৫ সালের শুরু থেকে স্বাভাবিক প্রসবসেবা চালু করেন।

প্রথম প্রসব করানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে লিলি বলেন, প্রথম ডেলিভারির সময় খুব ভয় কাজ করছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এক ঘণ্টার মধ্যেই সুস্থভাবে বাচ্চার জন্ম হয়। ওই সফলতার পর আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়।

তিনি জানান, শুরুতে মানুষ দ্বিধায় থাকলেও ধীরে ধীরে তার ওপর আস্থা তৈরি হয়। বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকেও প্রসূতিরা আসেন। এখন পর্যন্ত তার করানো নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০টিতে।

লিলি বলেন, প্রতিটি মাকে আগে থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ দেই। প্রসবব্যথা শুরু হলে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলি। ঝুঁকিপূর্ণ রোগী হলে যথাসময়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। তবে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তখন সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন মানুষের সেবা দিই। সবচেয়ে ভালো লাগে, যেসব শিশুর জন্ম আমার হাতে হয়েছে, কয়েক বছর পর তাদের মায়েরা আবার সেই সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। তখন মনে হয়, নিজের সন্তানের মতোই তাদের বেড়ে ওঠা দেখছি।

স্থানীয় কুলসুম আক্তার বলেন, এই কমিউনিটি ক্লিনিক আমাদের গরিব মানুষের অনেক উপকার করে। এখানে নরমাল ডেলিভারি হয়, ওষুধও পাওয়া যায়। বাইরে গেলে অনেক টাকা লাগে, এখানে সেই চাপ নেই।

লাইলি আক্তার বলেন, বাড়ির কাছেই হাসপাতাল হওয়ায় খুব সুবিধা হয়। আমার বড় মেয়েরও এখানে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। দূরে যেতে হয়নি।

লিপা আক্তার বলেন, আমার দুটি সন্তানই এই ক্লিনিকে হয়েছে। এখানে কোনো বড় খরচ নেই। তাই এলাকার মানুষ নির্ভয়ে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, এখানে প্রায় দেড় হাজারের মতো স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। বাইরে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি এলাকার মানুষের জন্য বড় আশীর্বাদ।

মনসুর আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। দূরে হাসপাতালে যাওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন। এই ক্লিনিক থাকায় আশপাশের মানুষ খুব উপকৃত হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান বলেন, জেলায় ১১০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি নরমাল ডেলিভারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) হিসেবে মেহেরুন নেহার লিলি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক গর্ভবতী মা নিরাপদ প্রসবসেবা পাচ্ছেন।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

এক দশকে ১৫শ নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন তেঁতুলিয়ার লিলি

Update Time : ০৭:২৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি এখন গর্ভবতী মায়েদের ভরসার ঠিকানা। এর পেছনে রয়েছেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি। গত এক দশকে তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রসূতির নরমাল ডেরিভারি করিয়ে এলাকায় অনন্য আস্থা অর্জন করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকের একটি কক্ষে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন লিলি। শিশুদের নিয়ে এসেছেন অনেক মা। গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়া, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ সবই চলছে একসঙ্গে।

১৯৯৮ সালে স্থানীয় বাসিন্দা রমিনা খাতুনের দেওয়া জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক। ক্লিনিকটি থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। দূরত্ব ও যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে প্রসবব্যথা উঠলেই এখন অনেক পরিবার ছুটে আসে এই ক্লিনিকে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন মেহেরুন নেহার লিলি। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ছয় মাসের কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৫ সালের শুরু থেকে স্বাভাবিক প্রসবসেবা চালু করেন।

প্রথম প্রসব করানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে লিলি বলেন, প্রথম ডেলিভারির সময় খুব ভয় কাজ করছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এক ঘণ্টার মধ্যেই সুস্থভাবে বাচ্চার জন্ম হয়। ওই সফলতার পর আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়।

তিনি জানান, শুরুতে মানুষ দ্বিধায় থাকলেও ধীরে ধীরে তার ওপর আস্থা তৈরি হয়। বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকেও প্রসূতিরা আসেন। এখন পর্যন্ত তার করানো নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০টিতে।

লিলি বলেন, প্রতিটি মাকে আগে থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ দেই। প্রসবব্যথা শুরু হলে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলি। ঝুঁকিপূর্ণ রোগী হলে যথাসময়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। তবে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তখন সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন মানুষের সেবা দিই। সবচেয়ে ভালো লাগে, যেসব শিশুর জন্ম আমার হাতে হয়েছে, কয়েক বছর পর তাদের মায়েরা আবার সেই সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। তখন মনে হয়, নিজের সন্তানের মতোই তাদের বেড়ে ওঠা দেখছি।

স্থানীয় কুলসুম আক্তার বলেন, এই কমিউনিটি ক্লিনিক আমাদের গরিব মানুষের অনেক উপকার করে। এখানে নরমাল ডেলিভারি হয়, ওষুধও পাওয়া যায়। বাইরে গেলে অনেক টাকা লাগে, এখানে সেই চাপ নেই।

লাইলি আক্তার বলেন, বাড়ির কাছেই হাসপাতাল হওয়ায় খুব সুবিধা হয়। আমার বড় মেয়েরও এখানে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। দূরে যেতে হয়নি।

লিপা আক্তার বলেন, আমার দুটি সন্তানই এই ক্লিনিকে হয়েছে। এখানে কোনো বড় খরচ নেই। তাই এলাকার মানুষ নির্ভয়ে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, এখানে প্রায় দেড় হাজারের মতো স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। বাইরে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি এলাকার মানুষের জন্য বড় আশীর্বাদ।

মনসুর আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। দূরে হাসপাতালে যাওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন। এই ক্লিনিক থাকায় আশপাশের মানুষ খুব উপকৃত হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান বলেন, জেলায় ১১০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি নরমাল ডেলিভারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) হিসেবে মেহেরুন নেহার লিলি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক গর্ভবতী মা নিরাপদ প্রসবসেবা পাচ্ছেন।