Dhaka ০৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধায় নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

জেলা প্রতিনিধি
12 / 100 SEO Score

 

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা গাইবান্ধার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষ।প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও গাছপালা। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে- এমন শঙ্কা স্থানীয়দের।

শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেল ৩টার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য বলছে, জেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে তিস্তা নদীর পানি সবচেয়ে বেশি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। নদীটির পানি বর্তমানে বিপৎসীমার মাত্র ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি পয়েন্টে যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদীর পানির উচ্চতা ১৮ দশমিক ৬৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীটির পানি ৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে।

গাইবান্ধা শহরের নিউব্রিজ পয়েন্টে ঘাঘট নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২০ দশমিক ২১ মিটার। এটি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪ মিটার নিচে রয়েছে। গত এক দিনে নদীটির পানি বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার।

অন্যদিকে, কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির উচ্চতা ২৮ দশমিক ৯৫ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীটির পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার, যা জেলার নদীগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এতে তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

শুধু করতোয়া নদীতেই কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। চকরহিমাপুর পয়েন্টে নদীটির পানির উচ্চতা ১৮ দশমিক ২১ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪৯ মিটার নিচে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ নদীর পানি ৩৪ সেন্টিমিটার কমেছে।

পাউবোর তথ্য বলছে, গত ১৭ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ১৮ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও, উজানের ঢলের কারণে নদীগুলোর পানির প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার অন্তত ২৫টি এলাকায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নদী গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। ইতোমধ্যে প্রায় ২ শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য থেকে জানা গেছে।

নদীপাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও বসতঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও আবার উঠান থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে নদীর গহ্বর। আতঙ্কে অনেকে ঘরের টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, ‘আমাদের এলাকার বিঘার পর বিঘা পাটখেত ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বছরের সব পরিশ্রম এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি।’

সুন্দরগঞ্জের এক নদীপাড়ের বাসিন্দা বলেন, ‘নদীর ভাঙন দেখে আমরা দিশেহারা। এখন বাড়িঘর সরাব, নাকি সহায়-সম্বল বাঁচাব- কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রতিদিনই মনে হয়, এই বুঝি বাড়িটাও নদীতে চলে গেল।’

ভাঙন ঠেকাতে জেলার প্রায় ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জিও ব্যাগের সংখ্যা কম। আবার অনেক জায়গায় কাজ ধীরগতিতে হওয়ায় নদীর তীব্র স্রোতে ফেলা জিও ব্যাগও দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে, ভাঙন থামানো যাচ্ছে না।

বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষ এখন পানির উচ্চতা ও নদীর স্রোত, দুটোর দিকেই সতর্ক নজর রাখছেন। কারণ, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, জেলার কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তাই তাৎক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

গাইবান্ধায় নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

Update Time : ০১:৫১:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
12 / 100 SEO Score

 

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা গাইবান্ধার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষ।প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও গাছপালা। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে- এমন শঙ্কা স্থানীয়দের।

শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেল ৩টার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য বলছে, জেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে তিস্তা নদীর পানি সবচেয়ে বেশি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। নদীটির পানি বর্তমানে বিপৎসীমার মাত্র ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি পয়েন্টে যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদীর পানির উচ্চতা ১৮ দশমিক ৬৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীটির পানি ৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে।

গাইবান্ধা শহরের নিউব্রিজ পয়েন্টে ঘাঘট নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২০ দশমিক ২১ মিটার। এটি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪ মিটার নিচে রয়েছে। গত এক দিনে নদীটির পানি বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার।

অন্যদিকে, কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির উচ্চতা ২৮ দশমিক ৯৫ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীটির পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার, যা জেলার নদীগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এতে তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

শুধু করতোয়া নদীতেই কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। চকরহিমাপুর পয়েন্টে নদীটির পানির উচ্চতা ১৮ দশমিক ২১ মিটার, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪৯ মিটার নিচে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ নদীর পানি ৩৪ সেন্টিমিটার কমেছে।

পাউবোর তথ্য বলছে, গত ১৭ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ১৮ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও, উজানের ঢলের কারণে নদীগুলোর পানির প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার অন্তত ২৫টি এলাকায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নদী গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। ইতোমধ্যে প্রায় ২ শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য থেকে জানা গেছে।

নদীপাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও বসতঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও আবার উঠান থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে নদীর গহ্বর। আতঙ্কে অনেকে ঘরের টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, ‘আমাদের এলাকার বিঘার পর বিঘা পাটখেত ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বছরের সব পরিশ্রম এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি।’

সুন্দরগঞ্জের এক নদীপাড়ের বাসিন্দা বলেন, ‘নদীর ভাঙন দেখে আমরা দিশেহারা। এখন বাড়িঘর সরাব, নাকি সহায়-সম্বল বাঁচাব- কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রতিদিনই মনে হয়, এই বুঝি বাড়িটাও নদীতে চলে গেল।’

ভাঙন ঠেকাতে জেলার প্রায় ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জিও ব্যাগের সংখ্যা কম। আবার অনেক জায়গায় কাজ ধীরগতিতে হওয়ায় নদীর তীব্র স্রোতে ফেলা জিও ব্যাগও দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে, ভাঙন থামানো যাচ্ছে না।

বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলের মানুষ এখন পানির উচ্চতা ও নদীর স্রোত, দুটোর দিকেই সতর্ক নজর রাখছেন। কারণ, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, জেলার কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তাই তাৎক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।