মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে জাতীয় মাছ ইলিশ
***বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও কমেনি দাম
***হাজার থেকে ২৮০০ টাকা কেজি, ইলিশ এখন বিলাসী খাবার
***দাম শুনে খালি হাতে ফিরছেন অনেক ক্রেতা
***মৌসুমেও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে জাতীয় মাছ
বর্ষা মানেই ইলিশের মৌসুম। নদী-সমুদ্র থেকে বাজারে আসতে শুরু করেছে রুপালি ইলিশের ঝলক। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ, মাছের সারিতে দেখা মিলছে নানা আকারের ইলিশ। কিন্তু বাজারে ইলিশ থাকলেও দাম শুনে অনেক ক্রেতাকেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।
মৌসুমের শুরুতে ইলিশের এমন চড়া দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্তরা। জাতীয় মাছ ইলিশ এখন অনেকের কাছে স্বাদের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে সামর্থ্যের হিসাব।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশ ঘিরে বাজারে ব্যস্ততা থাকলেও ক্রেতাদের মধ্যে নেই আগের মতো স্বস্তি। শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার, চন্দ্রিমা বাজার, ঢাকা উদ্যান, কাদেরাবাদ হাউজিং ও জেনেভা ক্যাম্প বাজারে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়।
দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা: বাজারে ৪৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আর এক কেজি বা তার বেশি ওজনের বড় ইলিশের দাম উঠেছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
দাম জানতে এসে অনেক ক্রেতাই শেষ পর্যন্ত ইলিশ না কিনে অন্য মাছ নিয়ে ফিরছেন। তাদের অভিযোগ, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলে এত দাম দিয়ে ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
টাউন হল বাজারের ক্রেতা বাবু বলেন, “ইলিশ কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু দাম শুনে ছোট মাছ নিয়েই ফিরে যাচ্ছি। সবারই ইলিশ খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এত দাম দিয়ে কেনা সম্ভব হচ্ছে না।”
আরেক ক্রেতা চন্দনা শিরিন জানান, কয়েকটি দোকান ঘুরে এক কেজির একটু বেশি ওজনের দুটি ইলিশ কিনেছেন ৪ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে। তাঁর অভিযোগ, বাজারে তাজা মাছের চেয়ে কোল্ড স্টোরের ইলিশই বেশি দেখা যাচ্ছে।
সন্তানের আবদার, বাজেটের বাধা: চন্দ্রিমা বাজারের ক্রেতা সাইফুল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, “বাচ্চারা ইলিশ খেতে চেয়েছিল। তাই ছোট একটি মাছ কিনেছি। বড় ইলিশ কেনার সামর্থ্য নেই।”
এক চাকরিজীবী ক্রেতা বলেন, “ইলিশের মৌসুমে অন্তত এক-দুইবার কিনতে চাই। কিন্তু এক কেজি ইলিশ কিনতেই কয়েক দিনের বাজার খরচ শেষ হয়ে যায়।”
ঢাকা উদ্যান বাজারের গৃহিণী রোকেয়া বেগমের ভাষ্য, “বাজারে মাছ আছে, কিন্তু দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। তাই শুধু দেখে যাচ্ছি।”
বিক্রেতাদেরও একই কথা: চন্দ্রিমা বাজারের ইলিশ বিক্রেতা হোসেন বলেন, “আমাদের এখানে ছোট আকারের ইলিশ বেশি বিক্রি হয়। দাম এক হাজার থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। বড় ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে আনলেও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কেনা কঠিন হয়ে যায়।”
টাউন হল বাজারের বিক্রেতা বাদশা বলেন, “এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে এখনো বাজারে তাজা ইলিশের সরবরাহ খুব বেশি নয়। কোল্ড স্টোরের মাছই বেশি।”
সরবরাহ বাড়লেও কমেনি চাপ: ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে বর্তমানে বাজারে ইলিশের উপস্থিতি বাড়লেও সাধারণ ক্রেতার নাগালের মধ্যে আসেনি দাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের দাম নির্ভর করে সরবরাহ, আকার, মৌসুম, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। মৌসুমে উৎপাদন বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগী ও সংরক্ষণ খরচের কারণে অনেক সময় বাজারে দাম কমে না।
বর্ষার এই সময়ে বাজারে রুপালি ইলিশের ঝলক দেখা গেলেও তা এখনো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য শুধুই দেখার বিষয়। ইলিশের স্বাদ নিতে হলে অনেককেই হিসাব মেলাতে হচ্ছে সংসারের অন্য খরচের সঙ্গে।




















