জলাবদ্ধতায় অচল নগরজীবন, সমাধানের পথ কী
***ড্রেনেজ সংকট, খাল দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ
****বৃষ্টিতে অচল রাজধানী, বাড়ছে জনদুর্ভোগ
***বাসাবাড়িতে পানি, বিশুদ্ধ পানির সংকট
রাজধানীতে বর্ষা যেন এখন শুধু স্বস্তির বৃষ্টি নয়, বরং আতঙ্কের আরেক নাম। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই সড়ক ডুবে যায়, অলিগলি পরিণত হয় খালে, বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে ময়লা পানি, থমকে যায় যান চলাচল। প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলেও নাগরিক দুর্ভোগ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উন্নয়ন, ড্রেনেজ সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবতা বলছে, জলাবদ্ধতা এখন রাজধানীবাসীর নিত্যসঙ্গী।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর নিউমার্কেট, মিরপুর, ধানমন্ডি, হাতিরপুল, কাঁঠালবাগান, কারওয়ান বাজার, গ্রিন রোড, লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার বাসাবাড়ির নিচতলা পর্যন্ত প্লাবিত হয়। অনেক ভবনের রিজার্ভ ট্যাংকে ময়লা পানি ঢুকে বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে। পানির মোটর অচল হয়ে পড়ায় রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও দেখা দেয় ভোগান্তি। একটি প্রাকৃতিক বৃষ্টিই কীভাবে পুরো নগরজীবনকে অচল করে দিতে পারে, তার বাস্তব চিত্র আবারও সামনে এসেছে।
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানুষের চলাচলে। অনেক সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল এমনকি গণপরিবহনও ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়। কোথাও কোথাও গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকে মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে। অফিসগামী মানুষকে ভিজে কাপড়েই কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়েছে, আবার অনেকে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও কম নয়। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী পানি ডিঙিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে বাড়ি ফিরে গেছে।
ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। বাজার ও বিপণিবিতানের সামনে পানি জমে থাকায় ক্রেতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দিনের পর দিন দোকান খুলেও অনেক ব্যবসায়ী প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারেন না। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ে। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর একই সমস্যা কেন ফিরে আসে? নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধারের অনেক অংশ দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের যে স্বাভাবিক পথ ছিল, তা অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দ্রুত কংক্রিটের বিস্তার এবং পানি শোষণের জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকায় সামান্য সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। অনেক এলাকায় ড্রেনের সক্ষমতা বর্তমান নগর বাস্তবতার তুলনায় অপর্যাপ্ত। আবার যেসব ড্রেন রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে না। একদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে অকার্যকর ড্রেনেজ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, উন্নয়নকাজ ও ড্রেন সংস্কারের জন্য দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হলেও বৃষ্টি এলেই সেই সংস্কারের কার্যকারিতা চোখে পড়ে না। করদাতারা প্রশ্ন তুলছেন, উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগর অচল হয়ে যায়, তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি কোথায় রয়ে যাচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে পুরোনো ড্রেনেজ অবকাঠামো এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই চাপ সামলাতে পারছে না। ভবিষ্যতে এমন বৃষ্টির ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই শুধু বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেও পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, আধুনিক ও পর্যাপ্ত সক্ষমতার ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, নির্মাণকাজে সঠিক পরিকল্পনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ড্রেনে ফেলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ না করা হয়।
রাজধানী বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনের কেন্দ্র। তাই প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতায় নগরজীবন অচল হয়ে পড়া শুধু নাগরিক ভোগান্তির বিষয় নয়, এটি উৎপাদনশীলতা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করা সম্ভব।
প্রতি বর্ষায় একই প্রশ্ন ফিরে আসে আর কতদিন এমন দুর্ভোগ? রাজধানীবাসী এখন আর সাময়িক সমাধানের আশ্বাস নয়, কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগের বাস্তব ফল দেখতে চান। কারণ একটি আধুনিক নগরের পরিচয় কেবল উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ক নয়; বরং এমন অবকাঠামো, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সচল রাখতে সক্ষম।




















