Dhaka ০৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তারের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 / 100 SEO Score

 

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ও দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলে ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি। মূলত মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগের ওপর ভিত্তি করে বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন অধরা থাকা এই আসামিকে ধরতে তার মেয়ের কর্মস্থলের তথ্যটি প্রথম সূত্র হিসেবে কাজ করে। তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে মেয়ের গতিবিধি ও কর্মস্থল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাড়ি চিহ্নিত করেন। ছদ্মবেশে বাড়িটি নজরদারিতে রাখার পর মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি পুরোনো ক্লু—নাকের ঠিক নিচে থাকা একটি আঁচিল বা কালো দাগ—শনাক্তকরণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

বুধবার গভীর রাতে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিবির একটি চৌকস দল সাধারণ পোশাকে ওই বাসায় গিয়ে কড়া নাড়ে। দরজা খোলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি না দেখিয়ে নিজেদের মেয়ের অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। এত রাতে অফিসের লোকজন আসায় ভেতর থেকে সন্দেহ নিয়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এগিয়ে আসেন এবং রাতে আসার কারণ জানতে চান।

ডিবির কর্মকর্তারা তখন কৌশলগতভাবে ওই ব্যক্তির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাড়ির অল্প আলোতেই তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত জন্মদাগটি দেখতে পান। অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।’ নিজের মুখে এ কথা স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ডিবির দল তাকে হাতকড়া পরায়।

মামলার নথি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর মোজাফফর। আক্রমণের রাতে তিনি ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই সশরীরে রাষ্ট্রপতিকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন এবং ঠান্ডা মাথায় সরাসরি গুলি চালান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পরপরই মোজাফফর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে একটি ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত বার্তা দেন—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’।

১৯৮১ সালের ৩১ মে সরকারি বাহিনী পুনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিহত হলে মোজাফফর বুঝতে পারেন তার বাঁচার কোনো পথ নেই। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলেও মোজাফফর এবং তার সহযোগী মেজর এস এম খালেদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানকালে তিনি নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেন। সম্পূর্ণ নতুন ছদ্মনাম ধারণ করে এবং চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন এনে তিনি সেখানে থাকতেন। কল ট্র্যাকিং এড়াতে পুরোনো চেনা পরিমণ্ডল ও পারিবারিক যোগাযোগের সব সূত্রও তিনি বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন। কেবল ভারতেই নয়, ভুয়া নাগরিকত্ব ও জাল নথির সাহায্যে পাসপোর্ট তৈরি করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর করেছেন। এ কারণেই ইন্টারপোল বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা দীর্ঘ সময় তার আসল নামে কোনো হদিস পাননি।

জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফেরেন এবং রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা বনানী ডিওএইচএসে বসবাস শুরু করেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এলাকাটি পরিচিত হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিমুখ এক বয়োবৃদ্ধ সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে প্রতিবেশীদেরও সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না।

গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এ কারণে প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে এবং তাদের নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ার (জুডিশিয়াল প্রসেস) অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জিয়াউর রহমানের পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তারের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের গল্প

Update Time : ০৭:৩৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ও দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলে ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি। মূলত মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগের ওপর ভিত্তি করে বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন অধরা থাকা এই আসামিকে ধরতে তার মেয়ের কর্মস্থলের তথ্যটি প্রথম সূত্র হিসেবে কাজ করে। তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে মেয়ের গতিবিধি ও কর্মস্থল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাড়ি চিহ্নিত করেন। ছদ্মবেশে বাড়িটি নজরদারিতে রাখার পর মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি পুরোনো ক্লু—নাকের ঠিক নিচে থাকা একটি আঁচিল বা কালো দাগ—শনাক্তকরণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

বুধবার গভীর রাতে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিবির একটি চৌকস দল সাধারণ পোশাকে ওই বাসায় গিয়ে কড়া নাড়ে। দরজা খোলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি না দেখিয়ে নিজেদের মেয়ের অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। এত রাতে অফিসের লোকজন আসায় ভেতর থেকে সন্দেহ নিয়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এগিয়ে আসেন এবং রাতে আসার কারণ জানতে চান।

ডিবির কর্মকর্তারা তখন কৌশলগতভাবে ওই ব্যক্তির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাড়ির অল্প আলোতেই তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত জন্মদাগটি দেখতে পান। অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।’ নিজের মুখে এ কথা স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ডিবির দল তাকে হাতকড়া পরায়।

মামলার নথি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর মোজাফফর। আক্রমণের রাতে তিনি ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই সশরীরে রাষ্ট্রপতিকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন এবং ঠান্ডা মাথায় সরাসরি গুলি চালান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পরপরই মোজাফফর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে একটি ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত বার্তা দেন—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’।

১৯৮১ সালের ৩১ মে সরকারি বাহিনী পুনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিহত হলে মোজাফফর বুঝতে পারেন তার বাঁচার কোনো পথ নেই। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলেও মোজাফফর এবং তার সহযোগী মেজর এস এম খালেদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানকালে তিনি নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেন। সম্পূর্ণ নতুন ছদ্মনাম ধারণ করে এবং চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন এনে তিনি সেখানে থাকতেন। কল ট্র্যাকিং এড়াতে পুরোনো চেনা পরিমণ্ডল ও পারিবারিক যোগাযোগের সব সূত্রও তিনি বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন। কেবল ভারতেই নয়, ভুয়া নাগরিকত্ব ও জাল নথির সাহায্যে পাসপোর্ট তৈরি করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর করেছেন। এ কারণেই ইন্টারপোল বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা দীর্ঘ সময় তার আসল নামে কোনো হদিস পাননি।

জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফেরেন এবং রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা বনানী ডিওএইচএসে বসবাস শুরু করেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এলাকাটি পরিচিত হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিমুখ এক বয়োবৃদ্ধ সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে প্রতিবেশীদেরও সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না।

গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এ কারণে প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে এবং তাদের নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ার (জুডিশিয়াল প্রসেস) অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে।