Dhaka ০৮:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুদকের শীর্ষপদ ফাঁকা: জমছে অভিযোগ, আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

4 / 100 SEO Score

 

*****চার মাস ধরে কমিশনশূন্য দুদক
*****শতাধিক অভিযোগ ও চার্জশিট ঝুলে আছে
****আলোচিত দুর্নীতি মামলার অগ্রগতি থমকে
****নতুন কমিশনের অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

চার মাসের বেশি সময় ধরে চেয়ারম্যান ও কমিশনারবিহীন অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রশাসনিক কাজ চলমান থাকলেও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সম্পন্ন করা যায় না এমন প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই আটকে আছে। ফলে নতুন মামলা অনুমোদন, অনুসন্ধান শুরু, চার্জশিট দাখিল, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেফতারিসহ নানা আইনি পদক্ষেপে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। এতে শতাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি আলোচিত দুর্নীতি মামলাগুলোর অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ চললেও আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে তদন্ত কর্মকর্তারা অনুসন্ধান শেষ করলেও পরবর্তী আইনি ধাপগুলোতে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগের ফাইল বাড়লেও নিষ্পত্তির গতি কমে গেছে।

গত ৩ মার্চ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদায় নেয়। এরপর থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ চার মাসেও নতুন কমিশন দায়িত্ব না নেওয়ায় কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে দুদক।

দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চার মাস ধরে কমিশনশূন্য দুদক, স্থবির অনুমোদননির্ভর কার্যক্রম: দুদক সূত্র বলছে, বর্তমানে শতাধিক অভিযোগ ও একাধিক অনুসন্ধান কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চার্জশিটও আটকে আছে। তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া মামলা অনুমোদন, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা চার্জশিট দাখিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

নতুন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের কয়েকজন ব্যক্তির নাম সম্ভাব্য কমিশনার হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত চলমান অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পি কে হালদার থেকে সালমান এফ রহমান আলোচিত মামলাগুলো অপেক্ষায়: কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আলোচিত বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা। পি কে হালারসংশ্লিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রায় ১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি মামলা এখনো অনুমোদন পায়নি। এসব মামলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের দুটি চার্জশিট প্রস্তুত থাকলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় তা আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ইউসিবি ব্যাংক ও আরমিট গ্রুপ থেকে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধানও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বাইরে আরও কয়েকটি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তাবও নতুন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্যদিকে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে ১১টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৬টি মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় সেগুলো দায়ের করা সম্ভব হয়নি। এসব মামলায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ আনার প্রস্তুতি রয়েছে।

নতুন কমিশনের অপেক্ষায় দুর্নীতিবিরোধী লড়াই: শুধু আলোচিত ব্যক্তি নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তও কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিটিসিএলের ফাইভ-জি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মামলা দায়েরের সুপারিশ এবং করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়েরের প্রস্তাবও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তকারীরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আইনি কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কমিশন দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করলে আটকে থাকা শতাধিক অভিযোগ, একাধিক চার্জশিট এবং আলোচিত দুর্নীতি মামলাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ খুলবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের এই নেতৃত্বশূন্যতা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের কার্যকারিতা ও জনআস্থার ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

দুদকের শীর্ষপদ ফাঁকা: জমছে অভিযোগ, আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

Update Time : ০৯:৩৭:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

*****চার মাস ধরে কমিশনশূন্য দুদক
*****শতাধিক অভিযোগ ও চার্জশিট ঝুলে আছে
****আলোচিত দুর্নীতি মামলার অগ্রগতি থমকে
****নতুন কমিশনের অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

চার মাসের বেশি সময় ধরে চেয়ারম্যান ও কমিশনারবিহীন অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রশাসনিক কাজ চলমান থাকলেও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সম্পন্ন করা যায় না এমন প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই আটকে আছে। ফলে নতুন মামলা অনুমোদন, অনুসন্ধান শুরু, চার্জশিট দাখিল, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেফতারিসহ নানা আইনি পদক্ষেপে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। এতে শতাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি আলোচিত দুর্নীতি মামলাগুলোর অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ চললেও আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে তদন্ত কর্মকর্তারা অনুসন্ধান শেষ করলেও পরবর্তী আইনি ধাপগুলোতে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগের ফাইল বাড়লেও নিষ্পত্তির গতি কমে গেছে।

গত ৩ মার্চ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদায় নেয়। এরপর থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ চার মাসেও নতুন কমিশন দায়িত্ব না নেওয়ায় কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে দুদক।

দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চার মাস ধরে কমিশনশূন্য দুদক, স্থবির অনুমোদননির্ভর কার্যক্রম: দুদক সূত্র বলছে, বর্তমানে শতাধিক অভিযোগ ও একাধিক অনুসন্ধান কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চার্জশিটও আটকে আছে। তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া মামলা অনুমোদন, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা চার্জশিট দাখিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

নতুন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের কয়েকজন ব্যক্তির নাম সম্ভাব্য কমিশনার হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত চলমান অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পি কে হালদার থেকে সালমান এফ রহমান আলোচিত মামলাগুলো অপেক্ষায়: কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আলোচিত বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা। পি কে হালারসংশ্লিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রায় ১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি মামলা এখনো অনুমোদন পায়নি। এসব মামলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের দুটি চার্জশিট প্রস্তুত থাকলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় তা আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ইউসিবি ব্যাংক ও আরমিট গ্রুপ থেকে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধানও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বাইরে আরও কয়েকটি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তাবও নতুন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্যদিকে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে ১১টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৬টি মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় সেগুলো দায়ের করা সম্ভব হয়নি। এসব মামলায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ আনার প্রস্তুতি রয়েছে।

নতুন কমিশনের অপেক্ষায় দুর্নীতিবিরোধী লড়াই: শুধু আলোচিত ব্যক্তি নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তও কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিটিসিএলের ফাইভ-জি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মামলা দায়েরের সুপারিশ এবং করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়েরের প্রস্তাবও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তকারীরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আইনি কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কমিশন দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করলে আটকে থাকা শতাধিক অভিযোগ, একাধিক চার্জশিট এবং আলোচিত দুর্নীতি মামলাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ খুলবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের এই নেতৃত্বশূন্যতা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের কার্যকারিতা ও জনআস্থার ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।