Dhaka ১০:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদিতে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরবে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের ধারণা, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে একদিকে যেমন তাদের সৌদি আরবের প্রতি প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার রক্ষা করতে হতে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের ভূমিকা জটিল হয়ে উঠবে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান সংঘাত প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল। গত বছর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। বর্তমানে সৌদি আরবে হাজারো পাকিস্তানি সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে কড়া বার্তা দিয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের ওপর হামলাকে আমরা পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করি। এটি আমাদের রেড লাইন।’

সোমবার হুথিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে চার বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, এত দ্রুত উত্তেজনা বাড়বে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় হুথিদের হামলা বিস্তৃত হলে তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

এ ছাড়া লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে পাকিস্তানসহ বহু দেশের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের ওপর বড় ধরনের হামলা হলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবে হামলার পরিধি আরও বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ইসলামাবাদের। পাকিস্তানের দুই সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অবস্থানের পার্থক্য বাড়ছে।

পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলীর মতে, ইরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে এবং ইসলামাবাদ বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। তার ভাষায়, ‘ধারাবাহিক সংলাপ, কূটনীতি ও সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই।’

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান একদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে দেশটিকে।

রয়টার্সকে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ‘হতাশা থাকলেও আমরা মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে আসছি না। এতে আমাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে এবং এটি সচল রাখাই আমাদের স্বার্থ।’

তবে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, ‘যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থে। কিন্তু সৌদি আরব যদি আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াব—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

সূত্র: রয়টার্স

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সৌদিতে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

Update Time : ১২:২৩:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরবে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের ধারণা, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে একদিকে যেমন তাদের সৌদি আরবের প্রতি প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার রক্ষা করতে হতে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের ভূমিকা জটিল হয়ে উঠবে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান সংঘাত প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল। গত বছর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। বর্তমানে সৌদি আরবে হাজারো পাকিস্তানি সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে কড়া বার্তা দিয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের ওপর হামলাকে আমরা পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করি। এটি আমাদের রেড লাইন।’

সোমবার হুথিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে চার বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, এত দ্রুত উত্তেজনা বাড়বে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় হুথিদের হামলা বিস্তৃত হলে তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

এ ছাড়া লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে পাকিস্তানসহ বহু দেশের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের ওপর বড় ধরনের হামলা হলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবে হামলার পরিধি আরও বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ইসলামাবাদের। পাকিস্তানের দুই সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অবস্থানের পার্থক্য বাড়ছে।

পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলীর মতে, ইরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে এবং ইসলামাবাদ বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। তার ভাষায়, ‘ধারাবাহিক সংলাপ, কূটনীতি ও সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই।’

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান একদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে দেশটিকে।

রয়টার্সকে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ‘হতাশা থাকলেও আমরা মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে আসছি না। এতে আমাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে এবং এটি সচল রাখাই আমাদের স্বার্থ।’

তবে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, ‘যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থে। কিন্তু সৌদি আরব যদি আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াব—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

সূত্র: রয়টার্স