‘ওজেম্পিক ফেস’ ঘিরে প্রসাধনী কোম্পানির ব্যবসা
ওজন কমানোর ওষুধের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যশিল্পে তৈরি হচ্ছে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা। দ্রুত ওজন কমানোর ফলে মুখের চর্বি কমে যাওয়া, ত্বক ঝুলে পড়া ও মুখের স্বাভাবিক পূর্ণতা হারানোর মতো পরিবর্তনকে বলা হচ্ছে ‘ওজেম্পিক ফেস’। আর মানুষের এই উদ্বেগকে কেন্দ্র করে নতুন পণ্য ও সৌন্দর্য চিকিৎসা নিয়ে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে বিশ্বের বড় প্রসাধনী কোম্পানিগুলো
ওজন কমানোর বিশ্বজুড়ে ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। আর এতে গণহারে তৈরি হচ্ছে নতুন বিপত্তি। যার মধ্যে সাধারণ সমস্যা হলো মুখের ত্বক ঝুলে পড়া ও স্বাভাবিক পূর্ণতা বা ভরাট মুখ হারানো। এসব সমস্যা মোকাবেলায় নতুন পণ্য ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে বিশ্বের বড় প্রসাধনী কোম্পানিগুলো। বাজারে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে সুইজারল্যান্ডের ত্বক পরিচর্যাপণ্য নির্মাতা গ্যাল্ডারমা, ব্রাজিলের নেচুরা ও ফরাসি জায়ান্ট লরিয়েল।
ওজন কমানোর ওষুধ ওজেম্পিক আজকাল বেশ জনপ্রিয়। সেই সূত্র উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সঙ্গে ‘ওজেম্পিক ফেস’ শব্দটি পরিচিতি পেয়েছে। দ্রুত ওজন কমানোর ফলে মুখের চর্বি কমে যাওয়া, ত্বক ঝুলে পড়া ও মুখের পূর্ণতা হারানোর মতো পরিবর্তনকে এ নামে বর্ণনা করা হয়। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ এ সমস্যার সরাসরি মূল কারণ নয়। বরং দ্রুত ওজন কমে যাওয়ার কারণে এসব বিপত্তি।
এ ধরনের জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধের মধ্যে রয়েছে নোভো নরডিস্কের ওজেম্পিক ও ওয়েগোভি এবং এলি লিলির জেপবাউন্ড। ওষুধগুলো এমন একটি হরমোন অনুকরণ করে, যা পেট ভরা থাকার অনুভূতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে।
ফাইজারের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০৩০ সাল নাগাদ ওজন কমানোর ওষুধের বাজারে বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে দ্রুত ওজন কমানোর পর ত্বক ঝুলে পড়া ও ভরাট মুখ হারানোর সমস্যা সমাধানে চিকিৎসকদের কাছে যাওয়া বাড়বে। এতে নি ত্বক পরিচর্যা ও সৌন্দর্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাজার তৈরি হচ্ছে।
বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ২০২৫ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ ধরনের চিকিৎসা থেকে আয় আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মুখের প্লাস্টিক সার্জন ও জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল সোমেনেক জানান, গত এক বছরে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ ধরনের চিকিৎসা নেয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, চার-ছয় মাসে দ্রুত ওজন কমলে মুখের পূর্ণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
লরিয়েলের ২০ শতাংশ মালিকানাধীন গ্যাল্ডারমা গত বছর একটি গবেষণা চালায়। এতে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্বকের পরিবর্তনে তাদের বিদ্যমান চিকিৎসাপদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়।
গ্যাল্ডারমার ইনজেকশনভিত্তিক নান্দনিক চিকিৎসা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান অ্যান-সেসিল শেভরিয়ে বলেন, ত্বক ঝুলে পড়া, দৃঢ়তা হারানো, মুখের কিছু অংশ বসে যাওয়া ও ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্কাল্পট্রা প্রাকৃতিক কোলাজেন উৎপাদনে উদ্দীপনা জোগায়। অন্যদিকে, রেস্টিলেন হায়ালুরোনিক অ্যাসিডভিত্তিক ডার্মাল ফিলার।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেডিক্যাল ইনসাইটের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৩ শতাংশ সৌন্দর্য বিষয়ক চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রেসক্রিপশনের ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারীদের কারণে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছে। আর ৪৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের ধারণা, এসব ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ওজন কমানোর পর মুখের পরিবর্তন মোকাবেলার চিকিৎসার চাহিদা বাড়বে।
লরিয়েলও এ বাজার নিয়ে গবেষণা করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কর্মকর্তা দেলফিন ভিগিয়ে-ওভাস জানান, জিএলপি-১ ব্যবহারকারীদের নিয়ে আলাদা গবেষণায় পণ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এ শ্রেণির ভোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় তারা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন।
নেচুরার প্রধান উদ্ভাবন ও গবেষণা কর্মকর্তা ম্যানুয়েল ক্রাউস জানান, প্রতিষ্ঠানটি জিএলপি-১ ব্যবহারকারীদের দিয়ে বিদ্যমান পণ্য পরীক্ষা করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চিকিৎসাপণ্য তৈরি করছে। তার মতে, এসব ওষুধ দ্রুত নতুন সৌন্দর্যচর্চার চাহিদা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে শুধু ক্রিম নয়, সাপ্লিমেন্ট ও খাওয়ার উপযোগী পণ্যও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের ত্বক ও পূর্ণতা হারানোর পেছনে বয়স, হরমোনের পরিবর্তন এবং পুষ্টির ঘাটতির মতো বিষয়ও কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা সংস্থা কেএফএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫০-৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে জিএলপি-১ ওষুধের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এ বয়সে স্বাভাবিকভাবেই কোলাজেন কমে আসে। মেনোপজের সময় ও পরে নারীদের ইস্ট্রোজেন উৎপাদনও কমে যায়।
কিংস কলেজ লন্ডনের পরামর্শক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বেইবেই ডু-হারপুরের মতে, ‘ওজেম্পিক ফেস’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর। ওষুধটি কোলাজেন গলিয়ে দেয় না; বরং তুলনামূলক ধীরে ওজন কমালে মুখের ত্বকে গুরুতর পরিবর্তন কম হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু পরিচর্যাপণ্য ত্বকের চেহারা ও গুণমান উন্নত করতে পারে। তবে মুখের নিচের চর্বির স্তর কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট পূর্ণতার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। ক্রিম ত্বকের ওপরের ও মাঝের স্তরে কাজ করলেও মুখের গভীর চর্বির স্তরে পৌঁছাতে পারে না। এ কারণে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা ফিলারের মতো চিকিৎসা এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক কার্যকর হতে পারে।



















