ডেঙ্গু দমনে জালিয়াতি: বিদেশি ব্র্যান্ডের ছদ্মবেশে নকল কীটনাশক
ডেঙ্গু মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে সরবরাহ করা কীটনাশক নিয়ে বহুল আলোচিত জালিয়াতির ঘটনায় প্রায় তিন বছর পর আদালতে চার্জশিট দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তে উঠে এসেছে, সিঙ্গাপুর থেকে আমদানির দাবি করা কীটনাশক আসলে ওই দেশের উৎপাদিত ছিল না; বরং অজ্ঞাত উৎস থেকে সংগ্রহ করা রাসায়নিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নকল মোড়কে ভরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) সরবরাহ করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলাউদ্দিন এবং নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। তবে পরিচয় নিশ্চিত করা না যাওয়ায় লি কিউইয়াং নামে এক বিদেশি নাগরিককে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
দরপত্র থেকে বিতর্কের শুরু: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডেঙ্গু মশক নিধনে ব্যবহারের জন্য ৫ হাজার কেজি বিটিআই (Bacillus thuringiensis var. israelensis) কীটনাশক কিনতে দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। শর্ত অনুযায়ী পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া অথবা ভারতের তৈরি হতে হতো।
১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫ টাকা মূল্যের দরপত্রে কার্যাদেশ পায় মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, তারা সিঙ্গাপুরের Best Chemical Co. (S) Pte Ltd-এর উৎপাদিত কীটনাশক সরবরাহ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাবদ প্রায় ১৬ লাখ ৯২ হাজার টাকাও জমা দেয়।
উদ্বোধনের কয়েক দিনের মধ্যেই পাল্টে যায় চিত্র: সরবরাহ করা কীটনাশক শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ডিএনসিসির মেয়র উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লি কিউইয়াং নামে এক ব্যক্তিকে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় করিয়ে কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
কিন্তু মাত্র ১১ দিনের মাথায় পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। ১৪ আগস্ট সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানায়, বাংলাদেশে তারা এমন কোনো কীটনাশক সরবরাহ করেনি। পরে ডিএনসিসির চিঠির জবাবে লিখিতভাবেও একই তথ্য নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি।
তদন্তে মিলল প্রতারণার প্রমাণ: ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা অজ্ঞাত উৎস থেকে সংগ্রহ করা রাসায়নিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানের নকল মোড়কে ভরে সরবরাহ করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. জেহাদ হোসেন জানান, নথিপত্র যাচাই, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের আগস্টে মামলার তদন্তভার গ্রহণের পর তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
মামলার অগ্রগতি: ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট ডিএনসিসির সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. রাহাত আল ফয়সাল মামলাটি দায়ের করেন। পরে আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাদের কারাগারে পাঠানো হলেও কয়েক দিন পর আদালত পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী সেলিনা বেগম (ইউনা) বলেন, মামলায় তিনি নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। তবে ডিবির দাখিল করা চার্জশিট এখনও তার হাতে পৌঁছেনি।
প্রশ্নের মুখে ক্রয় ও যাচাই প্রক্রিয়া: ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারি সংস্থার ক্রয়, যাচাই ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নকল মোড়কে কীটনাশক সরবরাহ এবং সেটি সরকারি পর্যায়ে উদ্বোধন হওয়ার পর প্রতারণা প্রকাশ পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।





















