Dhaka ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নতুন মোড়, বারের সেই তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে এক তরুণীর সন্ধান করছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফ ও তার বন্ধু দীপের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা গেছে।

এদিকে তাহসিফের বাবার করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে তার এই বক্তব্য নিছক দুর্ঘটনাকে সামনে আনার অপচেষ্টা নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে সম্প্রতি নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ মোটরসাইকেলে এসে পৌঁছান তাহসিফ ও ২৪-২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। সে সময় হেলমেট পরিহিত অবস্থায় তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপও।

ফুটেজে দেখা যায়, গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরা ওই তরুণীর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। সেখানে তারা প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান। পরে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় চলে যান। ওই তরুণী তাদের সঙ্গে টঙ্গী গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী সংস্থা জানায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঘটনার রাতে তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা আদালতের নথিতে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ পুলিশকে জানিয়েছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা ভয় পেয়ে দুই দিকে দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে পুলিশের ধারণা, সেখানে মাদকসেবন বা অন্য কোনো অপরাধের সন্দেহে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তবে ওই দুই পুলিশ সদস্যের পরিচয়, ধাওয়ার প্রকৃত কারণ, তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার সত্যতা এবং ঘটনাস্থলে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কীভাবে এলো—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, দীপের দেওয়া বয়ানে চরম অসংগতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, পুরো ঘটনাক্রমেই তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যুর আসল রহস্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আদালত থেকে তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। তিনি সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন নাকি এর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ছিল, তা বিশদভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তা শনাক্তের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই দীপকে আটক করে এবং তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শুক্রবার রাতে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। শুক্রবার মধ্যরাত ১টার দিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

two − 1 =

About Author Information

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নতুন মোড়, বারের সেই তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

Update Time : ০৬:৪৯:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে এক তরুণীর সন্ধান করছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফ ও তার বন্ধু দীপের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা গেছে।

এদিকে তাহসিফের বাবার করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে তার এই বক্তব্য নিছক দুর্ঘটনাকে সামনে আনার অপচেষ্টা নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে সম্প্রতি নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ মোটরসাইকেলে এসে পৌঁছান তাহসিফ ও ২৪-২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। সে সময় হেলমেট পরিহিত অবস্থায় তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপও।

ফুটেজে দেখা যায়, গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরা ওই তরুণীর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। সেখানে তারা প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান। পরে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় চলে যান। ওই তরুণী তাদের সঙ্গে টঙ্গী গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী সংস্থা জানায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঘটনার রাতে তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা আদালতের নথিতে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ পুলিশকে জানিয়েছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা ভয় পেয়ে দুই দিকে দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে পুলিশের ধারণা, সেখানে মাদকসেবন বা অন্য কোনো অপরাধের সন্দেহে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তবে ওই দুই পুলিশ সদস্যের পরিচয়, ধাওয়ার প্রকৃত কারণ, তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার সত্যতা এবং ঘটনাস্থলে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কীভাবে এলো—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, দীপের দেওয়া বয়ানে চরম অসংগতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, পুরো ঘটনাক্রমেই তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যুর আসল রহস্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আদালত থেকে তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। তিনি সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন নাকি এর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ছিল, তা বিশদভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তা শনাক্তের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই দীপকে আটক করে এবং তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শুক্রবার রাতে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। শুক্রবার মধ্যরাত ১টার দিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।