দেশে ৮২ লাখ মাদকসেবী, চিকিৎসার আওতায় নেই প্রায় ৭১ লাখ
তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাদকের বিস্তার বেশি; গাঁজা-ইয়াবায় আসক্তি সর্বাধিক, চিকিৎসা পেয়েছেন মাত্র ১৩.২ শতাংশ
তরুণদের একটি বড় অংশ যখন মাদকের ঝুঁকিতে, তখন তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও রয়ে গেছে সীমিত। মাদক সেবনকারীদের বড় অংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা থাকলেও অনেকের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে উঠছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত জাতীয় গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে অবৈধ মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। তাদের মধ্যে ৭১ লাখের বেশি মানুষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবার আওতায় আসেননি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ অবৈধ মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। মাদক সেবনকারীদের গড় বয়স ৩১ বছর। তাদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের হার ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ মাদক সেবনকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন। প্রথম মাদক গ্রহণের গড় বয়স ২০ বছর।
২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত এ গবেষণায় মাদক ব্যবহারের বিস্তারের পাশাপাশি চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান ও আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, সামাজিক পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
যেভাবে পরিচালিত হয় গবেষণা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আরএমসিএল) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ গবেষণার শিরোনাম ‘এস্টিমেশন অব দ্য নাম্বার অ্যান্ড ক্যাটাগরি অব পারসন্স অ্যাবিউজিং ড্রাগস অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাক্টরস: এ নেশনওয়াইড স্টাডি ইন বাংলাদেশ’।
গবেষণায় নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড (এনএসইউএম) ও সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে মাদক সেবনের ধরন, ব্যবহারকারীদের বয়স, পেশা, আর্থসামাজিক অবস্থা, মাদক গ্রহণের কারণ এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবার প্রাপ্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্তি বেশি: গবেষণায় দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। এ মাদক সেবনকারীর আনুমানিক সংখ্যা ৬০ লাখ ৭৯ হাজার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা। এ মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৯২ হাজার।
এ ছাড়া প্রায় ২০ লাখ ২০ হাজার মানুষ অ্যালকোহল এবং ৩ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ কোডিনযুক্ত ওষুধ বা ফেনসিডিলজাতীয় মাদক সেবন করেন। হেরোইন সেবনকারীর সংখ্যা ৩ লাখ ২২ হাজার এবং ঘুমের ওষুধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সেবনকারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫ হাজার। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ।
প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি আইস ও এলএসডির মতো সিন্থেটিক মাদকের ব্যবহারও গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব মাদকের ব্যবহার বেড়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হলেও নতুন ধরনের মাদকের বিস্তারও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সিন্থেটিক মাদকের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ ও রংপুরে প্রাদুর্ভাব বেশি: বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে মাদক সেবনের প্রাদুর্ভাবের হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে, ৬ দশমিক ২ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর, যেখানে এ হার ৬ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে মাদক সেবনের হার ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগে এ হার সবচেয়ে কম, ২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
তবে মোট মাদক সেবনকারীর সংখ্যার হিসাবে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। জনসংখ্যার আকারের কারণে এ বিভাগে আনুমানিক ২২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মাদক সেবন করেন। চট্টগ্রাম বিভাগে এ সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার।
গ্রাম ও শহরের মধ্যে মাদক সেবনের হারেও পার্থক্য রয়েছে। গবেষণায় শহরাঞ্চলে মাদক সেবনের হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকায় ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে মাদক ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা বেশি।
তরুণ ও শ্রমজীবীদের মধ্যে বেশি বিস্তার: মাদক সেবনকারীদের বয়স ও পেশাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সের। তাদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের হার ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আবার প্রায় ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের প্রথম মাদক গ্রহণের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া মাদক সেবনকারীদের ৯৯ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ এবং শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ বিবাহিত।
পেশাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক সেবনকারী দিনমজুর, ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর পরিবহনশ্রমিক ১৫ দশমিক ১ শতাংশ, শিক্ষার্থী ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, দরজি, হকার ও নাপিত ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেকার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
মাদক সেবনকারীদের পরিবারের গড় মাসিক আয় ২১ হাজার ২৩১ টাকা। অন্যদিকে, মাদক কেনার পেছনে তারা প্রতিদিন গড়ে ২১৭ টাকা ব্যয় করেন। নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এ ব্যয় সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচেও চাপ তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ মাদক সেবনকারী জানিয়েছেন, স্থানীয় মাদক বিক্রেতা ও বন্ধুদের মাধ্যমে সহজেই মাদক পাওয়া যায়। সমবয়সীদের প্রভাব, কৌতূহল, অর্থনৈতিক হতাশা, প্রেমজনিত টানাপোড়েন এবং মানসিক বিপর্যয়কে প্রথমবার মাদক গ্রহণের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বাইরে অধিকাংশ: গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, মাদক সেবনকারীদের মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা পেয়েছেন। বাকি ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ এসব সেবার বাইরে রয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৭১ লাখ মানুষ মাদকনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাননি।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ অন্তত একবার মাদক ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ পারিবারিক চাপ, ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ নিজের উপলব্ধি এবং ১৯ শতাংশ শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাদক ছাড়তে চেয়েছেন।
তবে মাদক ছাড়ার ইচ্ছা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগের অভাবে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না। ফলে মাদকনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সামাজিকভাবেও মাদক সেবনকারীদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৬৮ শতাংশ পরিবার ও সমাজে বৈষম্য, অপমান কিংবা নির্যাতনের শিকার হন। প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ পুলিশি হয়রানি বা গ্রেফতারের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
পুনর্বাসনসেবার বিষয়ে জানতে চাইলে ৬৯ শতাংশ মাদক সেবনকারী বিনা মূল্যে বা সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ৪১ দশমিক ২ শতাংশ চিকিৎসার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ চেয়েছেন।
শাস্তি নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গুরুত্ব: মাদক সমস্যার সমাধানে শুধু গ্রেফতার ও শাস্তিনির্ভর পদক্ষেপের পরিবর্তে জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে গবেষণাটি। এতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনকেন্দ্র সম্প্রসারণ, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং মাদকনির্ভর ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাদকনির্ভর ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য ক্ষতি হ্রাসমূলক কর্মসূচি জোরদারের সুপারিশও রয়েছে।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ বলেন, দেশে মাদক গ্রহণের সূচনা হচ্ছে অল্প বয়সে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন। এ ছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাদক সহজলভ্য।
তিনি বলেন, মাদক সহজলভ্য হওয়া এবং অল্প বয়সে এর সংস্পর্শে আসার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মাদক প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মাদক সরবরাহের উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. এ. মোহিত কামাল বলেন, চিকিৎসা শেষে কেউ যদি পুরোনো পরিবেশ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক কলঙ্কের মধ্যে ফিরে যান, তাহলে আবার মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, মাদকনির্ভর ব্যক্তিদের অপমানজনক পরিচয়ে না ডেকে অসুস্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের জন্য মানসিক সহায়তা, পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস) বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটিরও সদস্য।
তিনি বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদকের চাহিদা কমানো, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে তিনটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। সরকারগুলো মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সের কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, সরকার আন্তরিক হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ জন্য শুধু বক্তব্য বা ঘোষণা নয়, বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে মাদকের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
মাদকনির্ভর ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। অনেক পুনর্বাসনকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মাস চিকিৎসার পর রোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফিরে পুরোনো পরিবেশে গেলে আবার মাদক গ্রহণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তার মতে, মাদকনির্ভরতা থেকে সুস্থ জীবনে ফিরতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রে রেখে নির্দিষ্ট সময় পর ছেড়ে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
মাদক কেনাবেচায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, মাদক সরবরাহের প্রচলিত স্থল, নৌ ও আকাশপথের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক লেনদেন ও সরবরাহের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য, মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ জনপ্রতিনিধিদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, শুধু আধুনিক সরঞ্জাম, ইউনিফর্ম বা অস্ত্র দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য দায়িত্বশীলতা, নিষ্ঠা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষের মাদক সেবনের চিত্র এবং তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার বাইরে থাকার তথ্য বলছে, মাদক সমস্যা মোকাবিলায় প্রচলিত উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা, মাদকের সহজলভ্যতা কমানো এবং আসক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এ সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ।

















