Dhaka ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা কমাতে বড় উদ্যোগ সরকারের

বিশেষ প্রতিবেদক
6 / 100 SEO Score

 

◆ পদ্মা ও মেঘনার পানি শোধন করে সরবরাহ হবে আট শহরে
◆ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা
◆ অর্থায়নে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ঋণ দেবে এডিবি
◆ পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার ও নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া এবং পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি বাড়ায় নিরাপদ পানির বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। এত দিন শহরাঞ্চলের পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর যে নির্ভরতা ছিল, তা কমিয়ে এবার নদীর পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে শোধনের পর আটটি শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের প্রস্তাবিত ‘ক্লাস্টার টাউন ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি পৃথক ক্লাস্টারে এ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে মেঘনা নদীর পানি ব্যবহার করে চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও কুমিল্লা শহরে এবং পদ্মা নদীর পানি শোধন করে ঈশ্বরদী, পাবনা, গোপালপুর ও নাটোর পৌরসভায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ নদীর একটি সহজপ্রাপ্য উৎসকে কাজে লাগিয়ে একাধিক শহরের জন্য সমন্বিত পানি সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আসবে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা উদ্বেগজনক, সেসব এলাকায় নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি নদীর উৎস থেকে একাধিক শহরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আলাদা আলাদা পানি উত্তোলন ও সরবরাহ অবকাঠামোর ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এহতেশামুল রাসেল খান বলেন, কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদের জন্য পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি সরবরাহ করা হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকটও প্রকট।

পুরোনো পাইপে অপচয় হচ্ছে অর্ধেকের বেশি পানি
ডিপিএইচইর প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ নিম্নমানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এসব শহরের পানি সরবরাহ অবকাঠামোর বড় একটি অংশ পুরোনো ও জরাজীর্ণ। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত পিভিসি পাইপের কারণে সরবরাহ করা পানির অর্ধেকের বেশি অপচয় হচ্ছে। কোথাও কোথাও এসব পাইপের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দিয়ে দূষিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

অন্যদিকে, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পানির সংযোগে মিটার না থাকায় পানির ব্যবহার ও অপচয়ের সঠিক হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরবরাহ করা পানির পরিমাণ ও গুণগতমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও কমছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন উৎস থেকে পানি সরবরাহ নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালুর প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পুরোনো পানি সরবরাহ লাইন মেরামত ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদী থেকে পানি সংগ্রহের জন্য ইনটেক পয়েন্ট, পানি শোধনাগার এবং বিভিন্ন শহরে পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর পানি পরিশোধন করে নিরাপদ পানীয় জল হিসেবে সরবরাহ করা হবে।

আর্সেনিক ও আয়রনের ঝুঁকিতে দুই ক্লাস্টার
প্রকল্পের আওতাভুক্ত ঈশ্বরদী ও কুমিল্লা ক্লাস্টারের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি বেশি। পাশাপাশি পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে এসব এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে মানুষের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডিপিএইচইর তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদী ক্লাস্টারের ঈশ্বরদী, পাবনা, নাটোর ও গোপালপুর পৌরসভায় এ সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা ক্লাস্টারের কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, লাকসাম, বরুড়া, চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গুণগতমান ও স্তর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে বরুড়া পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিষয়টি উঠে আসে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় বরুড়া এলাকার পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিবেচনায় নিয়ে পৌরসভাটিকে প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একমত হন সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্মসচিব খাদিজা পারভীন জানান, গত ১৪ থেকে ১৮ জুন প্রকল্পটি নিয়ে এডিবির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই মিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পে ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অর্থায়ন পাইপলাইনে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নমনীয় ঋণের প্রস্তাবসহ এডিবির চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। পিইসি সভায় সুপারিশ পাওয়ার পর ঋণ নিয়ে দরকষাকষি শেষ করে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে পানি সরবরাহের পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের ছয়টিতে এ কার্যক্রম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অন্য প্রকল্পের মাধ্যমে চলমান রয়েছে। বাকি হাজীগঞ্জ ও গোপালপুর পৌরসভার স্যানিটেশন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এ প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে নদী থেকে পানি উত্তোলনের ফলে পরিবেশ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ছাড়পত্র নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) তা অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, পদ্মা ও মেঘনার পানিকে কাজে লাগিয়ে আট শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে নদীর পানির বছরব্যাপী প্রাপ্যতা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পানি শোধনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ অবকাঠামোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

11 − one =

About Author Information

ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা কমাতে বড় উদ্যোগ সরকারের

Update Time : ০৭:২৯:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
6 / 100 SEO Score

 

◆ পদ্মা ও মেঘনার পানি শোধন করে সরবরাহ হবে আট শহরে
◆ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা
◆ অর্থায়নে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা ঋণ দেবে এডিবি
◆ পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার ও নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া এবং পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি বাড়ায় নিরাপদ পানির বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। এত দিন শহরাঞ্চলের পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর যে নির্ভরতা ছিল, তা কমিয়ে এবার নদীর পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে শোধনের পর আটটি শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের প্রস্তাবিত ‘ক্লাস্টার টাউন ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি পৃথক ক্লাস্টারে এ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে মেঘনা নদীর পানি ব্যবহার করে চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও কুমিল্লা শহরে এবং পদ্মা নদীর পানি শোধন করে ঈশ্বরদী, পাবনা, গোপালপুর ও নাটোর পৌরসভায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ নদীর একটি সহজপ্রাপ্য উৎসকে কাজে লাগিয়ে একাধিক শহরের জন্য সমন্বিত পানি সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে আসবে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা উদ্বেগজনক, সেসব এলাকায় নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি নদীর উৎস থেকে একাধিক শহরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আলাদা আলাদা পানি উত্তোলন ও সরবরাহ অবকাঠামোর ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এহতেশামুল রাসেল খান বলেন, কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদের জন্য পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি সরবরাহ করা হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকটও প্রকট।

পুরোনো পাইপে অপচয় হচ্ছে অর্ধেকের বেশি পানি
ডিপিএইচইর প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ নিম্নমানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এসব শহরের পানি সরবরাহ অবকাঠামোর বড় একটি অংশ পুরোনো ও জরাজীর্ণ। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত পিভিসি পাইপের কারণে সরবরাহ করা পানির অর্ধেকের বেশি অপচয় হচ্ছে। কোথাও কোথাও এসব পাইপের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দিয়ে দূষিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।

অন্যদিকে, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পানির সংযোগে মিটার না থাকায় পানির ব্যবহার ও অপচয়ের সঠিক হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরবরাহ করা পানির পরিমাণ ও গুণগতমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও কমছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন উৎস থেকে পানি সরবরাহ নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালুর প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পুরোনো পানি সরবরাহ লাইন মেরামত ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদী থেকে পানি সংগ্রহের জন্য ইনটেক পয়েন্ট, পানি শোধনাগার এবং বিভিন্ন শহরে পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর পানি পরিশোধন করে নিরাপদ পানীয় জল হিসেবে সরবরাহ করা হবে।

আর্সেনিক ও আয়রনের ঝুঁকিতে দুই ক্লাস্টার
প্রকল্পের আওতাভুক্ত ঈশ্বরদী ও কুমিল্লা ক্লাস্টারের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি বেশি। পাশাপাশি পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে এসব এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে মানুষের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডিপিএইচইর তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদী ক্লাস্টারের ঈশ্বরদী, পাবনা, নাটোর ও গোপালপুর পৌরসভায় এ সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা ক্লাস্টারের কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, লাকসাম, বরুড়া, চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গুণগতমান ও স্তর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে বরুড়া পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিষয়টি উঠে আসে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় বরুড়া এলাকার পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিবেচনায় নিয়ে পৌরসভাটিকে প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একমত হন সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্মসচিব খাদিজা পারভীন জানান, গত ১৪ থেকে ১৮ জুন প্রকল্পটি নিয়ে এডিবির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই মিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পে ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অর্থায়ন পাইপলাইনে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নমনীয় ঋণের প্রস্তাবসহ এডিবির চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। পিইসি সভায় সুপারিশ পাওয়ার পর ঋণ নিয়ে দরকষাকষি শেষ করে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে পানি সরবরাহের পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের ছয়টিতে এ কার্যক্রম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অন্য প্রকল্পের মাধ্যমে চলমান রয়েছে। বাকি হাজীগঞ্জ ও গোপালপুর পৌরসভার স্যানিটেশন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এ প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে নদী থেকে পানি উত্তোলনের ফলে পরিবেশ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ছাড়পত্র নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) তা অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, পদ্মা ও মেঘনার পানিকে কাজে লাগিয়ে আট শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে নদীর পানির বছরব্যাপী প্রাপ্যতা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পানি শোধনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ অবকাঠামোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।