Dhaka ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিম্নবিত্তের আমিষের জোগানে বাড়ছে সংকট

বিশেষ প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

‘রুই-কাতলা কেনার সামর্থ্য নেই, তাই পাঙাশ-তেলাপিয়াই ছিল ভরসা। এখন সেই মাছ কিনতেও হিসাব মেলাতে হচ্ছে।’ রাজধানীর বাজারে মাছ কিনতে এসে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন সীমিত আয়ের বহু মানুষ। পরিবারের খাবারের তালিকায় মাছ রাখতে গিয়ে কেউ কমিয়ে দিচ্ছেন কেনার পরিমাণ, কেউ বেছে নিচ্ছেন কাটা মাছ, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন তুলনামূলক ছোট মাছের দাম কমার।

একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের আমিষের সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া। বাজারে অন্য মাছের দাম বেড়ে গেলে এই দুই মাছই ছিল অনেক পরিবারের বিকল্প। কিন্তু এখন এদের দামও কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় পৌঁছানোয় সেই ভরসায় টান পড়েছে। মাছের বাজারে এই মূল্যচাপ শুধু ক্রেতার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, পরিবারের খাদ্যতালিকায় আমিষের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের চিত্র বলছে, আকারভেদে পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। মাঝারি আকারের তেলাপিয়ার দাম প্রায় ২২০ টাকা, আর এক কেজির বেশি ওজনের তেলাপিয়া কিনতে গুনতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। ফলে তুলনামূলক সস্তা মাছ কিনেও আগের মতো পরিবারের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাছের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারেও। বাজারে মাছের সরবরাহ থাকলেও তা কেনার সক্ষমতা সবার সমান নয়। ফলে উৎপাদন বাড়ার পরও সাধারণ মানুষের কাছে মাছ কতটা সাশ্রয়ী থাকছে, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

সাত লাখ টনের বেশি উৎপাদন, তবু দামে স্বস্তি নেই: মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পাঙাশ উৎপাদিত হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন এবং তেলাপিয়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। দুই মাছ মিলিয়ে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। দেশের পুকুরে চাষ করা মাছের মধ্যে উৎপাদনের দিক থেকে এ দুটি প্রজাতি শীর্ষস্থানীয়।

ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এসব মাছ চাষ হয়। তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদন ও বাজারে ব্যাপক সরবরাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই পাঙাশ-তেলাপিয়া সাধারণ মানুষের মাছের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

তবে উৎপাদনের পরিমাণ বেশি থাকলেই খুচরা বাজারে দাম কম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মাছের পোনা, খাবার, বিদ্যুৎ, শ্রম এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে। সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে পাঙাশ-তেলাপিয়ার বাজারেও এমন ব্যয়ের চাপের কথা বলছেন বিক্রেতারা।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন দেশে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হওয়ার পরও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা কেন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে? উৎপাদন, পাইকারি বিপণন ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ের খরচ এবং মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ ছাড়া এ প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পাওয়া কঠিন।

কয়েক বছরে দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে: বাজারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তেলাপিয়ার দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে শুরু। বর্তমানে মাঝারি আকারের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২২০ টাকায়, আর বড় মাছের দাম ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। সে হিসাবে ১৪০ টাকা ভিত্তিমূল্য ধরলে মাঝারি তেলাপিয়ার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং বড় তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রায় ৭১ থেকে ৭৯ শতাংশ।

একইভাবে পাঙাশের দামও বেড়েছে। কয়েক বছর আগে ছোট ও মাঝারি আকারের পাঙাশ কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান। বর্তমানে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঙাশের দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। দুই থেকে তিন কেজি ওজনের মাছের দাম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, বড় আকারের মাছের দাম আরও বেশি।

অবশ্য মাছের আকার, মান, বাজার ও বিক্রয়স্থলভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে। তারপরও বাজারের এই চিত্র স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা এরশাদ আলী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। চার সদস্যের সংসারে মাছ কেনার ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাঁকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসাব করতে হচ্ছে।

এরশাদ আলী বলেন, ‘রুই, কাতলা, বোয়াল, শিংসহ অন্য মাছ তো আমরা কিনতেই পারি না। কিনতাম শুধু পাঙাশ আর তেলাপিয়া। এখন এগুলোর দামও বেশি, তাই মাছ কেনা কমিয়ে দিয়েছি।’

তিনি জানান, বাজারে কাটা পাঙাশ পাওয়া গেলে মাঝেমধ্যে আধা কেজি কিনে নেন। ছোট তেলাপিয়ার দাম কিছুটা কম থাকলে সেটিও কেনেন। তবে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত মাছ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মালিবাগ বাজারে পোশাকশ্রমিক দুলু মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাছ কেনা জরুরি হলেও বাড়তি দামের কারণে পরিমাণ কমাতে হচ্ছে তাঁকে।

দুলু মিয়া বলেন, ‘পরিবারে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী আছে, তাই মাছ না কিনলে চলে না। সে জন্য সপ্তাহে এক-দুই দিন বেশি দামেই পাঙাশ-তেলাপিয়া কিনি। তবে আগের চেয়ে কেনার পরিমাণ কমে গেছে। অন্য মাছের দাম বেশি হওয়ায় খরচ সামলাতে মাঝেমধ্যে কাটা মাছের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেও জানান তিনি।

উৎপাদন ব্যয়ের চাপে মাছের বাজার: মাছের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য, মাছের খাবার বা ফিডের দাম বাড়ায় চাষের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শ্রম ও মাছ পরিবহনের ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত।

কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, মাছের খাবারের দাম বাড়ায় চাষিরা বেশি খরচে মাছ উৎপাদন করছেন। ফলে পাইকারি বাজারে মাছের দামও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

পরিবহন ব্যয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগে মাছ আনা-নেওয়ার একটি গাড়ির ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে লাইনম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে।

তবে মাছের দামের ওপর এসব উপাদানের প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে উৎপাদন খরচ, পাইকারি ও খুচরা দামের তুলনামূলক হিসাব প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে পুরো মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা, বাজারভেদে দামের ব্যবধান এবং বিক্রেতার প্রকৃত মুনাফাও এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিক্রি কমছে, চাপে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও: মাছের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। বাড্ডা বাজারের মাছ বিক্রেতা আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, দাম বাড়ার পর মাছ বিক্রির পরিমাণ কমেছে।

বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আগে যেসব ক্রেতা এক থেকে দুই কেজি পাঙাশ বা তেলাপিয়া কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন অর্ধেক পরিমাণ কিনছেন। অর্থাৎ বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না মাছ।

এই পরিস্থিতিতে তৈরি হচ্ছে দ্বিমুখী চাপ। বেশি দামে মাছ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের ব্যয় বাড়ছে, আবার বেশি দামে বিক্রি করতে গিয়েও বিক্রেতারা ক্রেতার চাহিদা ধরে রাখতে পারছেন না। ফলে সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত বাজারের উভয় পক্ষকেই প্রভাবিত করছে।

তবে বিক্রি কমার সুনির্দিষ্ট হার, বিক্রেতাদের মুনাফা এবং পাইকারি পর্যায়ে দামের পরিবর্তন সম্পর্কে পরিমাপযোগ্য তথ্য না থাকায় সংকটের আর্থিক প্রভাবের পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

মাছের দাম বাড়লে পুষ্টি নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে: পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দাম বৃদ্ধি শুধু বাজারের ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির প্রশ্নও জড়িত। সীমিত আয়ের পরিবারে খাবারের বাজেট নির্দিষ্ট থাকায় কোনো পণ্যের দাম বাড়লে পরিমাণ কমানো কিংবা বিকল্প খাবার বেছে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে যেসব পরিবার তুলনামূলক কম দামের মাছের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মাছের পরিমাণ কমে গেলে খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের জোগানও কমতে পারে। তবে কত পরিবার মাছ খাওয়া কমিয়েছে এবং এর ফলে সামগ্রিক পুষ্টিতে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা নির্ধারণে আলাদা জরিপ ও খাদ্যগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাছের খাবারের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানোর উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মাছের খাবার নিয়ে গবেষণা এবং সাশ্রয়ী উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

উৎপাদন থেকে ভোক্তা সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন: পাঙাশ-তেলাপিয়ার বাজার পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিপুল উৎপাদন থাকলেও সাশ্রয়ী দামে মাছ পাওয়া নিশ্চিত করা আলাদা চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ব্যয় কমানো, পরিবহনব্যবস্থা দক্ষ করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করা গেলে দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক বিপণনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।

কারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পাঙাশ-তেলাপিয়া কেবল পছন্দের মাছ নয়; এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই মাছের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে বিকল্প মাছ কেনার সামর্থ্য না থাকা পরিবারগুলোই বেশি চাপে পড়বে।

দেশে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার সম্মিলিত উৎপাদন যখন ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন, তখন প্রশ্নটি শুধু কত মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, তা নয়—সেই মাছ সাধারণ মানুষের পাতে কতটা সাশ্রয়ী দামে পৌঁছাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার চাপ কমিয়ে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে দামের সামঞ্জস্য আনা না গেলে নিম্নবিত্তের আমিষের জোগানে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

8 − seven =

About Author Information

নিম্নবিত্তের আমিষের জোগানে বাড়ছে সংকট

Update Time : ০৭:৩১:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

‘রুই-কাতলা কেনার সামর্থ্য নেই, তাই পাঙাশ-তেলাপিয়াই ছিল ভরসা। এখন সেই মাছ কিনতেও হিসাব মেলাতে হচ্ছে।’ রাজধানীর বাজারে মাছ কিনতে এসে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন সীমিত আয়ের বহু মানুষ। পরিবারের খাবারের তালিকায় মাছ রাখতে গিয়ে কেউ কমিয়ে দিচ্ছেন কেনার পরিমাণ, কেউ বেছে নিচ্ছেন কাটা মাছ, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন তুলনামূলক ছোট মাছের দাম কমার।

একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের আমিষের সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া। বাজারে অন্য মাছের দাম বেড়ে গেলে এই দুই মাছই ছিল অনেক পরিবারের বিকল্প। কিন্তু এখন এদের দামও কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় পৌঁছানোয় সেই ভরসায় টান পড়েছে। মাছের বাজারে এই মূল্যচাপ শুধু ক্রেতার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, পরিবারের খাদ্যতালিকায় আমিষের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের চিত্র বলছে, আকারভেদে পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। মাঝারি আকারের তেলাপিয়ার দাম প্রায় ২২০ টাকা, আর এক কেজির বেশি ওজনের তেলাপিয়া কিনতে গুনতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। ফলে তুলনামূলক সস্তা মাছ কিনেও আগের মতো পরিবারের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাছের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারেও। বাজারে মাছের সরবরাহ থাকলেও তা কেনার সক্ষমতা সবার সমান নয়। ফলে উৎপাদন বাড়ার পরও সাধারণ মানুষের কাছে মাছ কতটা সাশ্রয়ী থাকছে, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

সাত লাখ টনের বেশি উৎপাদন, তবু দামে স্বস্তি নেই: মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পাঙাশ উৎপাদিত হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন এবং তেলাপিয়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। দুই মাছ মিলিয়ে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। দেশের পুকুরে চাষ করা মাছের মধ্যে উৎপাদনের দিক থেকে এ দুটি প্রজাতি শীর্ষস্থানীয়।

ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এসব মাছ চাষ হয়। তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদন ও বাজারে ব্যাপক সরবরাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই পাঙাশ-তেলাপিয়া সাধারণ মানুষের মাছের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

তবে উৎপাদনের পরিমাণ বেশি থাকলেই খুচরা বাজারে দাম কম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মাছের পোনা, খাবার, বিদ্যুৎ, শ্রম এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে। সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে পাঙাশ-তেলাপিয়ার বাজারেও এমন ব্যয়ের চাপের কথা বলছেন বিক্রেতারা।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন দেশে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হওয়ার পরও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা কেন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে? উৎপাদন, পাইকারি বিপণন ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ের খরচ এবং মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ ছাড়া এ প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পাওয়া কঠিন।

কয়েক বছরে দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে: বাজারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তেলাপিয়ার দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে শুরু। বর্তমানে মাঝারি আকারের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২২০ টাকায়, আর বড় মাছের দাম ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। সে হিসাবে ১৪০ টাকা ভিত্তিমূল্য ধরলে মাঝারি তেলাপিয়ার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং বড় তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রায় ৭১ থেকে ৭৯ শতাংশ।

একইভাবে পাঙাশের দামও বেড়েছে। কয়েক বছর আগে ছোট ও মাঝারি আকারের পাঙাশ কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান। বর্তমানে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঙাশের দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। দুই থেকে তিন কেজি ওজনের মাছের দাম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, বড় আকারের মাছের দাম আরও বেশি।

অবশ্য মাছের আকার, মান, বাজার ও বিক্রয়স্থলভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে। তারপরও বাজারের এই চিত্র স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা এরশাদ আলী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। চার সদস্যের সংসারে মাছ কেনার ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাঁকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসাব করতে হচ্ছে।

এরশাদ আলী বলেন, ‘রুই, কাতলা, বোয়াল, শিংসহ অন্য মাছ তো আমরা কিনতেই পারি না। কিনতাম শুধু পাঙাশ আর তেলাপিয়া। এখন এগুলোর দামও বেশি, তাই মাছ কেনা কমিয়ে দিয়েছি।’

তিনি জানান, বাজারে কাটা পাঙাশ পাওয়া গেলে মাঝেমধ্যে আধা কেজি কিনে নেন। ছোট তেলাপিয়ার দাম কিছুটা কম থাকলে সেটিও কেনেন। তবে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত মাছ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মালিবাগ বাজারে পোশাকশ্রমিক দুলু মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাছ কেনা জরুরি হলেও বাড়তি দামের কারণে পরিমাণ কমাতে হচ্ছে তাঁকে।

দুলু মিয়া বলেন, ‘পরিবারে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী আছে, তাই মাছ না কিনলে চলে না। সে জন্য সপ্তাহে এক-দুই দিন বেশি দামেই পাঙাশ-তেলাপিয়া কিনি। তবে আগের চেয়ে কেনার পরিমাণ কমে গেছে। অন্য মাছের দাম বেশি হওয়ায় খরচ সামলাতে মাঝেমধ্যে কাটা মাছের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেও জানান তিনি।

উৎপাদন ব্যয়ের চাপে মাছের বাজার: মাছের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য, মাছের খাবার বা ফিডের দাম বাড়ায় চাষের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শ্রম ও মাছ পরিবহনের ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত।

কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, মাছের খাবারের দাম বাড়ায় চাষিরা বেশি খরচে মাছ উৎপাদন করছেন। ফলে পাইকারি বাজারে মাছের দামও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

পরিবহন ব্যয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগে মাছ আনা-নেওয়ার একটি গাড়ির ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে লাইনম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে।

তবে মাছের দামের ওপর এসব উপাদানের প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে উৎপাদন খরচ, পাইকারি ও খুচরা দামের তুলনামূলক হিসাব প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে পুরো মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা, বাজারভেদে দামের ব্যবধান এবং বিক্রেতার প্রকৃত মুনাফাও এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিক্রি কমছে, চাপে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও: মাছের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। বাড্ডা বাজারের মাছ বিক্রেতা আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, দাম বাড়ার পর মাছ বিক্রির পরিমাণ কমেছে।

বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আগে যেসব ক্রেতা এক থেকে দুই কেজি পাঙাশ বা তেলাপিয়া কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন অর্ধেক পরিমাণ কিনছেন। অর্থাৎ বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না মাছ।

এই পরিস্থিতিতে তৈরি হচ্ছে দ্বিমুখী চাপ। বেশি দামে মাছ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের ব্যয় বাড়ছে, আবার বেশি দামে বিক্রি করতে গিয়েও বিক্রেতারা ক্রেতার চাহিদা ধরে রাখতে পারছেন না। ফলে সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত বাজারের উভয় পক্ষকেই প্রভাবিত করছে।

তবে বিক্রি কমার সুনির্দিষ্ট হার, বিক্রেতাদের মুনাফা এবং পাইকারি পর্যায়ে দামের পরিবর্তন সম্পর্কে পরিমাপযোগ্য তথ্য না থাকায় সংকটের আর্থিক প্রভাবের পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

মাছের দাম বাড়লে পুষ্টি নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে: পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দাম বৃদ্ধি শুধু বাজারের ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির প্রশ্নও জড়িত। সীমিত আয়ের পরিবারে খাবারের বাজেট নির্দিষ্ট থাকায় কোনো পণ্যের দাম বাড়লে পরিমাণ কমানো কিংবা বিকল্প খাবার বেছে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে যেসব পরিবার তুলনামূলক কম দামের মাছের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মাছের পরিমাণ কমে গেলে খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের জোগানও কমতে পারে। তবে কত পরিবার মাছ খাওয়া কমিয়েছে এবং এর ফলে সামগ্রিক পুষ্টিতে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা নির্ধারণে আলাদা জরিপ ও খাদ্যগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাছের খাবারের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানোর উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মাছের খাবার নিয়ে গবেষণা এবং সাশ্রয়ী উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

উৎপাদন থেকে ভোক্তা সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন: পাঙাশ-তেলাপিয়ার বাজার পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিপুল উৎপাদন থাকলেও সাশ্রয়ী দামে মাছ পাওয়া নিশ্চিত করা আলাদা চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ব্যয় কমানো, পরিবহনব্যবস্থা দক্ষ করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করা গেলে দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক বিপণনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।

কারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পাঙাশ-তেলাপিয়া কেবল পছন্দের মাছ নয়; এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই মাছের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে বিকল্প মাছ কেনার সামর্থ্য না থাকা পরিবারগুলোই বেশি চাপে পড়বে।

দেশে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার সম্মিলিত উৎপাদন যখন ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন, তখন প্রশ্নটি শুধু কত মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, তা নয়—সেই মাছ সাধারণ মানুষের পাতে কতটা সাশ্রয়ী দামে পৌঁছাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার চাপ কমিয়ে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে দামের সামঞ্জস্য আনা না গেলে নিম্নবিত্তের আমিষের জোগানে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।