পুতিনের পদচিহ্ন দিল্লিতে
চারপাশে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে পতিন ভারতের দিল্লিতে পা রাখলেন। ১১ টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে পতিনের প্রতি শভেচ্ছা ছিল চোখে পড়ার মতো। লাল গালিচা বিছানো হয়েছিল তাকে অভ্যথনা জানানোর জন্য।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আগের দিন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পতিন (বাঁয়ে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করমর্দন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকসের সদস্য নয়। তারপরও আগামীকাল শনিবার দিল্লিতে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বড় হয়ে উঠবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছায়া।
সম্মেলনের আয়োজক ভারত ছাড়াও চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরানসহ ব্রিকসের ১১টি দেশের নেতারা এই সম্মেলনে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সৌদি আরবও অংশ নিচ্ছে সম্মেলনে।
গত এক দশকে ব্রিকসের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। তাই জোটটি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান নিতে চায় না। তবে এত দিনে জোটটি যা অর্জন করেছে, সেগুলোকে আরও এগিয়ে নিতে চাইবে। একই সঙ্গে জি-২০ ও জি-৭-এর মতো জোটগুলোর বিকল্প হিসেবে নিজেদের আরও শক্তিশালী করে তুলতে চাইবে ব্রিকস।
বিবিসি মনিটরিংয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিকস দেশগুলো এখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ, বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ দখল করে আছে।
ব্রিকসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) প্রতিষ্ঠা। ব্যাংকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে।
আর্থিক সংকটে পড়া সদস্যদেশগুলোকে সহায়তা দিতে ব্রিকস ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি জরুরি রিজার্ভ ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। তবে তা এখন পর্যন্ত বাস্তবে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।
এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের নেতারা স্থানীয় মুদ্রায় আন্তসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ করার উপায় নিয়েও আলোচনা করতে পারেন। এটি মস্কো ও তেহরানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশের নেতারা দিল্লিতে আসতে শুরু করায় কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে হাজারো নিরাপত্তাকর্মী
১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশের নেতারা দিল্লিতে আসতে শুরু করায় কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে হাজারো নিরাপত্তাকর্মীছবি: এএফপি
ব্রিকস উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবেও নিজেদের অবস্থান আরও জোরালো করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জোটের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের দাবি জানাতে পারে। অনেক উন্নয়নশীল দেশের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরে না।
বিশেষ করে ভারতের জন্য এই সম্মেলন বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্ব দেওয়ার দাবিকে আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি করছে।
বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য আরও উন্মুক্ত করার মতো বিষয়গুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অনেক অগ্রাধিকার ব্রিকসের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর খুব কাছাকাছি।
তবে ব্রিকসের ভেতরে চীনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় একটি অংশে দেশটির শক্তিশালী উপস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেই পথও ভারতকে খুঁজে বের করতে হবে।
এবারের সম্মেলন থেকে একটি যৌথ বিবৃতি আদায় করতে পারাই দিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বিবৃতিকে আয়োজক দেশের জন্য প্রায় সময় কূটনৈতিক সাফল্যের একটি মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তবে ইরানে চলমান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য থাকায় এটি কঠিন হবে।
এই চ্যালেঞ্জটা কত বড়, গত মে মাসের একটি ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময় ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সম্মেলনের পর একটি যৌথ বিবৃতি দিতে একমত হতে পারেননি। ফলে আয়োজক দেশ ভারতকে ব্রিকসের সভাপতির পক্ষ থেকে বৈঠকের একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে হয়েছিল।
ব্রিকসের নেতারা আর্থিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে। বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলোও আলোচনায় আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে তা যেন সংঘাত এড়িয়ে যায়, সে জন্য ভাষা খুব সতর্কভাবে ব্যবহার করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই সম্মেলন সামনে রেখে দিল্লিকে দুর্গের মতো নিরাপত্তাবেষ্টিত করা হয়েছে। নেতারা আসতে শুরু করায় হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এরই মধ্যে দিল্লিতে পৌঁছেছেন। মোদি–পুতিন বৈঠকও হয়েছে। তাঁরা দুই দেশের বিশেষ সম্পর্ক আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। আজ শুক্রবার তাঁদের বৈঠকে জ্বালানি, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলনে, ২৩ অক্টোবর ২০২৪
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলনে, ২৩ অক্টোবর ২০২৪ফাইল ছবি: রয়টার্স
এবার ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হবে। শনিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। দুই দেশ ধীরে ধীরে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে অগ্রগতি দুই পক্ষের প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে।
ভূরাজনীতির বাইরেও রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারতের বাড়তে থাকা বাণিজ্যঘাটতি দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্মেলন শেষ করার দিকেই ব্রিকসের মনোযোগ থাকবে। কারণ, এতে জোটটির প্রভাব আরও জোরালো হবে।

























