Dhaka ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়ি পৌঁছে দিল সেনাবাহিনী যশোরের খাবারে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ: ছিটেরুটি থেকে শতবর্ষী জলযোগ ত্রিদেশীয় সিরিজে ভরাডুবি: তবুও বাংলাদেশের প্রশংসায় আফগান কোচ কক্সবাজারে সৈকতে ভেসে এলো আরও এক মরদেহ, নিহত বেড়ে ৪ সাজেক সড়কে ফের অবরোধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি বিজয়ার আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদ, প্রতিমায় সিঁদুর দিতে গিয়ে গৃহবধূর মৃত্যু পাকিস্তানে যাত্রীবাহী বাস উল্টে নিহত ১০, আহত ৪৪ বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবনতি, প্রশ্নের মুখে ক্রিকেটারদের নিবেদন সাইবার সিকিউরিটিসহ অন্যান্য আইন সংশোধনের চেষ্টা করছি: তথ্যমন্ত্রী দিনব্যাপী সফরে খুলনার দাকোপে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

যশোরের খাবারে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ: ছিটেরুটি থেকে শতবর্ষী জলযোগ

10 / 100 SEO Score

 

কোনো বাড়িতে অতিথি এলে কিংবা আত্মীয়ের দাওয়াত যশোরের অনেক পরিবারের আপ্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পায় ছিটেরুটি আর মুরগির লাল ঝোল। চালের গুঁড়ার গোলা কড়াইয়ে ছিটিয়ে তৈরি করা পাতলা রুটি, সঙ্গে ঝাল-মসলায় কষানো মুরগির মাংস। খাবারটি শুধু স্বাদের জন্য নয়, স্থানীয় আতিথেয়তার ঐতিহ্য হিসেবেও পরিচিত। আবার সকালের নাশতায় গরম লুচি ও ডাল, সঙ্গে মিষ্টি যশোর শহরের শতবর্ষী জলযোগে এই পরিচিত স্বাদ উপভোগ করতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দূরদূরান্তের ভোজনরসিকেরা।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোরের খাদ্যসংস্কৃতিতে রয়েছে এমন নানা বৈচিত্র্য। ঘরোয়া রান্নার ঐতিহ্য, বিশেষ অনুষ্ঠানের খাবার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত মিষ্টি এবং পুরোনো খাবারের দোকান সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের খাবার শুধু দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে না, বহন করে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক স্মৃতি ও স্থানীয় পরিচয়ও।

যশোরের খাবারের পরিচিতি বলতে ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল, জামতলার সাদেক গোল্লা এবং জলযোগের লুচি-ডালের কথা বিশেষভাবে সামনে আসে। পাশাপাশি রয়েছে নারিকেল দিয়ে মুরগির বিশেষ পদ, ঘাটকোলের রান্না, খেজুরের গুড়ের মিষ্টি এবং গ্রামীণ পিঠাপুলির ঐতিহ্য। এসব খাবারের কোনোটি ঘরোয়া আপ্যায়নের সঙ্গে, কোনোটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিচয়ের সঙ্গে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অতিথি আপ্যায়নে ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল: যশোরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় ছিটেরুটি ও মুরগির লাল ঝোলের অবস্থান আলাদা। স্থানীয় কথ্য ভাষায় মুরগিকে ‘কুকড়ো’ এবং মুরগির মাংসের ঝোলকে ‘কুকড়োর ঝোল’ বলা হয়। পারিবারিক দাওয়াত, আত্মীয়স্বজনের আগমন কিংবা বিশেষ উপলক্ষে এই খাবার পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।

ছিটেরুটি তৈরির প্রক্রিয়াও বেশ স্বতন্ত্র। সাধারণ রুটির মতো বেলে নেওয়া হয় না এটি। চালের গুঁড়ার সঙ্গে পানি মিশিয়ে তৈরি করা গোলা হাতের আঙুলের সাহায্যে গরম কড়াইয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কড়াইয়ের গায়ে গোলা ছড়িয়ে পাতলা, জালের মতো রুটি তৈরি হয়। রুটির গঠন ও প্রস্তুতপ্রণালিই একে অন্য ধরনের রুটি থেকে আলাদা করেছে।

২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে যশোর সদরের পোলতাডাঙ্গা গ্রামের সুরাইয়া বেগমের ছিটেরুটি তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গোলা খুব ঘন বা পাতলা হলে রুটির কাঙ্ক্ষিত গঠন পাওয়া যায় না। কড়াইতে অল্প তেল মেখে গোলা ছিটিয়ে রুটি তৈরি করতে হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই কেজি চালের গুঁড়ায় আট থেকে দশজনের খাবার তৈরি করা সম্ভব।

রুটির সঙ্গে পরিবেশিত মুরগির লাল ঝোলেও রয়েছে বিশেষত্ব। পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য মসলা দিয়ে মাংস ভালোভাবে কষিয়ে তাতে পানি দিয়ে রান্না করা হয়। ঝালের প্রাধান্য এবং ঘন লালচে ঝোল এই পদের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। শীতকালে কোনো কোনো পরিবারে মুরগির পরিবর্তে হাঁসের মাংসও পরিবেশন করা হয়।

সময়ের সঙ্গে রান্নার আয়োজন সহজ হয়েছে, বদলেছে মানুষের ব্যস্ততা। তবু বিশেষ উপলক্ষে ছিটেরুটি তৈরির রেওয়াজ ধরে রেখেছেন অনেক পরিবার। বাড়িতে প্রস্তুত করার সময় না পেলে শহরের কিছু খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন ভোজনরসিকেরা। ফলে এই খাবার এখনো যশোরের ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়নের একটি পরিচিত নাম।

মিষ্টির পরিচয়ে জামতলার সাদেক গোল্লা: যশোরের খাবারের পরিচিতি মিষ্টি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। জেলার শার্শা উপজেলার জামতলা বাজারের সাদেক গোল্লা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে ‘জামতলার মিষ্টি’ নামেও পরিচিত এই মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের কারিগরি ঐতিহ্য।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৫ সালে শেখ সাদেক আলীর হাত ধরে এই মিষ্টির যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এর পরিচিতি জামতলা ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। লালচে-বাদামি রং, নরম গঠন ও রসালো স্বাদের কারণে মিষ্টিটি ক্রেতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।

মিষ্টি কেনা বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের পরিচিত অংশ। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, উৎসবের আয়োজন কিংবা বিশেষ কোনো আনন্দের সংবাদ বিভিন্ন উপলক্ষে মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার রীতি রয়েছে। জামতলার সাদেক গোল্লাও স্থানীয় মানুষের এই অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি মিষ্টি নয়, যশোরের একটি এলাকার পরিচিতি বহনকারী খাদ্যপণ্য হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।

জলযোগের লুচি-ডালে ১৩৩ বছরের পথচলা: যশোর শহরের পুরোনো খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জলযোগ অন্যতম। ১৮৯৩ সালে কালীপদ বিশ্বাসের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ২০২৬ সাল হিসাবে এর পথচলা ১৩৩ বছরে পৌঁছেছে। তিন প্রজন্মের হাত ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান এখনো লুচি, ডাল ও মিষ্টির জন্য পরিচিত।

শহরের চৌরাস্তা এলাকায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সড়ক, স্থানীয়ভাবে রেল রোড নামে পরিচিত সড়কের পাশে জলযোগের অবস্থান। সকাল থেকে এখানে লুচি ও ডালের নাশতা খেতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ দোকানে বসে খান, কেউ বাড়ি কিংবা কর্মস্থলের জন্য খাবার নিয়ে যান।

জলযোগের পরিচিত খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে গরম লুচি, ডাল, সবজি, চমচম, কালোজাম, রসমালাই, পানতোয়া, মিহিদানা ও দই। তবে নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশের জন্য প্রতিষ্ঠানটির আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে খেজুরের গুড়ের এই মিষ্টির চাহিদা বাড়ে বলে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্ণধার সাধন বিশ্বাসের পরিবারের হাত ধরে ব্যবসাটি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের কর্মী ও পুরোনো ক্রেতাদের স্মৃতিতেও জায়গা করে নিয়েছে জলযোগ। কারও কাছে এটি সকালের নাশতার পরিচিত ঠিকানা, কারও কাছে যশোরে এলে পুরোনো স্বাদ ফিরে পাওয়ার জায়গা।

একটি ছোট খাবারের প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে, জলযোগ তার উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে খাবারের বাজারে পরিবর্তন এলেও পুরোনো স্বাদ, পরিচিত পরিবেশ ও ক্রেতাদের অভ্যাস প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

ঘরোয়া রান্নায় নারিকেলি মুরগি ও ঘাটকোল: যশোরের খাদ্যসংস্কৃতির আরেকটি দিক হলো স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি বিশেষ রান্না। নারিকেলি মুরগি তেমনই একটি পদ। নাম থেকেই বোঝা যায়, এ রান্নায় নারিকেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। নারিকেল ও মসলার সমন্বয়ে মুরগির মাংস রান্না করে তৈরি করা হয় ভিন্ন স্বাদের খাবার। তবে পরিবার ও রাঁধুনিভেদে এর প্রস্তুতপ্রণালিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

অন্যদিকে ঘাটকোল, যা ঘেঁটকচু নামেও পরিচিত, স্থানীয় রান্নার বৈচিত্র্যের একটি উদাহরণ। এ উদ্ভিদের উপযুক্ত অংশ রান্না করে ভর্তা, ভাজি কিংবা তরকারি হিসেবে পরিবেশন করা হয়। কোনো কোনো রান্নায় কাঁঠালের বিচি ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও নারিকেলের দুধের সঙ্গে ঘাটকোল রান্না করা হয়।

এ ধরনের পদ দেখায়, আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে ওঠে কেবল দামি বা বহুল প্রচলিত উপকরণ দিয়ে নয়; স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ, পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও রান্নার নিজস্ব কৌশলও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব খাবারের জনপ্রিয়তা অঞ্চল ও পরিবারভেদে ভিন্ন হতে পারে।
খেজুরের গুড়, পিঠাপুলি ও শীতের আয়োজন: যশোরের খাদ্যঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহ এবং তা জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের পরিচিত দৃশ্য। এই গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস ও নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়।

নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশের মতো মিষ্টি ঐতিহ্যবাহী উপকরণের সঙ্গে আধুনিক মিষ্টি তৈরির কৌশলের সংযোগ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে ভাপা পিঠা, পুলি ও পায়েসের মতো খাবার পরিবারকেন্দ্রিক উৎসব ও শীতের আয়োজনকে আরও আনন্দময় করে তোলে।

খাদ্যসংস্কৃতির এই দিকটি যশোরের গ্রামীণ জীবন ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। গুড় উৎপাদন, মিষ্টি তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে খাবারের ঐতিহ্য শুধু সংস্কৃতির অংশ নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি ক্ষেত্র।

ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা: যশোরের খাবারের বৈচিত্র্যকে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা হিসেবেও দেখা যায়। ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোলের মতো পারিবারিক আপ্যায়নের খাবার, জামতলার সাদেক গোল্লার মতো আঞ্চলিক মিষ্টি এবং জলযোগের মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠান—প্রতিটির রয়েছে আলাদা গল্প।

এসব খাবারের ইতিহাস, প্রস্তুতপ্রণালি ও সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের খাদ্যঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্রস্তুত, মানসম্মতভাবে পরিবেশন এবং উপযুক্ত বিপণনের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রকৃত স্বাদ ও প্রস্তুতপ্রণালি ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় উৎপাদকদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন।

সব মিলিয়ে, যশোরের খাদ্যসংস্কৃতি কোনো একক খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিথি আপ্যায়নের ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল, জামতলার সাদেক গোল্লা, জলযোগের লুচি-ডাল ও নলেন গুড়ের সন্দেশ, কিংবা ঘরোয়া রান্নার ঘাটকোল—প্রতিটি খাবার এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র স্বাদের পরিচয় তুলে ধরে। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারলে যশোরের খাবার কেবল স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে নয়, দেশের বৃহত্তর খাদ্যসংস্কৃতিতেও আরও সুপরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

14 + 5 =

About Author Information

যশোরের খাবারে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ: ছিটেরুটি থেকে শতবর্ষী জলযোগ

Update Time : ০৮:৪৬:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

কোনো বাড়িতে অতিথি এলে কিংবা আত্মীয়ের দাওয়াত যশোরের অনেক পরিবারের আপ্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পায় ছিটেরুটি আর মুরগির লাল ঝোল। চালের গুঁড়ার গোলা কড়াইয়ে ছিটিয়ে তৈরি করা পাতলা রুটি, সঙ্গে ঝাল-মসলায় কষানো মুরগির মাংস। খাবারটি শুধু স্বাদের জন্য নয়, স্থানীয় আতিথেয়তার ঐতিহ্য হিসেবেও পরিচিত। আবার সকালের নাশতায় গরম লুচি ও ডাল, সঙ্গে মিষ্টি যশোর শহরের শতবর্ষী জলযোগে এই পরিচিত স্বাদ উপভোগ করতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দূরদূরান্তের ভোজনরসিকেরা।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোরের খাদ্যসংস্কৃতিতে রয়েছে এমন নানা বৈচিত্র্য। ঘরোয়া রান্নার ঐতিহ্য, বিশেষ অনুষ্ঠানের খাবার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত মিষ্টি এবং পুরোনো খাবারের দোকান সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের খাবার শুধু দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে না, বহন করে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক স্মৃতি ও স্থানীয় পরিচয়ও।

যশোরের খাবারের পরিচিতি বলতে ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল, জামতলার সাদেক গোল্লা এবং জলযোগের লুচি-ডালের কথা বিশেষভাবে সামনে আসে। পাশাপাশি রয়েছে নারিকেল দিয়ে মুরগির বিশেষ পদ, ঘাটকোলের রান্না, খেজুরের গুড়ের মিষ্টি এবং গ্রামীণ পিঠাপুলির ঐতিহ্য। এসব খাবারের কোনোটি ঘরোয়া আপ্যায়নের সঙ্গে, কোনোটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিচয়ের সঙ্গে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অতিথি আপ্যায়নে ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল: যশোরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় ছিটেরুটি ও মুরগির লাল ঝোলের অবস্থান আলাদা। স্থানীয় কথ্য ভাষায় মুরগিকে ‘কুকড়ো’ এবং মুরগির মাংসের ঝোলকে ‘কুকড়োর ঝোল’ বলা হয়। পারিবারিক দাওয়াত, আত্মীয়স্বজনের আগমন কিংবা বিশেষ উপলক্ষে এই খাবার পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।

ছিটেরুটি তৈরির প্রক্রিয়াও বেশ স্বতন্ত্র। সাধারণ রুটির মতো বেলে নেওয়া হয় না এটি। চালের গুঁড়ার সঙ্গে পানি মিশিয়ে তৈরি করা গোলা হাতের আঙুলের সাহায্যে গরম কড়াইয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কড়াইয়ের গায়ে গোলা ছড়িয়ে পাতলা, জালের মতো রুটি তৈরি হয়। রুটির গঠন ও প্রস্তুতপ্রণালিই একে অন্য ধরনের রুটি থেকে আলাদা করেছে।

২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে যশোর সদরের পোলতাডাঙ্গা গ্রামের সুরাইয়া বেগমের ছিটেরুটি তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গোলা খুব ঘন বা পাতলা হলে রুটির কাঙ্ক্ষিত গঠন পাওয়া যায় না। কড়াইতে অল্প তেল মেখে গোলা ছিটিয়ে রুটি তৈরি করতে হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই কেজি চালের গুঁড়ায় আট থেকে দশজনের খাবার তৈরি করা সম্ভব।

রুটির সঙ্গে পরিবেশিত মুরগির লাল ঝোলেও রয়েছে বিশেষত্ব। পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য মসলা দিয়ে মাংস ভালোভাবে কষিয়ে তাতে পানি দিয়ে রান্না করা হয়। ঝালের প্রাধান্য এবং ঘন লালচে ঝোল এই পদের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। শীতকালে কোনো কোনো পরিবারে মুরগির পরিবর্তে হাঁসের মাংসও পরিবেশন করা হয়।

সময়ের সঙ্গে রান্নার আয়োজন সহজ হয়েছে, বদলেছে মানুষের ব্যস্ততা। তবু বিশেষ উপলক্ষে ছিটেরুটি তৈরির রেওয়াজ ধরে রেখেছেন অনেক পরিবার। বাড়িতে প্রস্তুত করার সময় না পেলে শহরের কিছু খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন ভোজনরসিকেরা। ফলে এই খাবার এখনো যশোরের ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়নের একটি পরিচিত নাম।

মিষ্টির পরিচয়ে জামতলার সাদেক গোল্লা: যশোরের খাবারের পরিচিতি মিষ্টি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। জেলার শার্শা উপজেলার জামতলা বাজারের সাদেক গোল্লা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে ‘জামতলার মিষ্টি’ নামেও পরিচিত এই মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের কারিগরি ঐতিহ্য।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৫ সালে শেখ সাদেক আলীর হাত ধরে এই মিষ্টির যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এর পরিচিতি জামতলা ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। লালচে-বাদামি রং, নরম গঠন ও রসালো স্বাদের কারণে মিষ্টিটি ক্রেতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।

মিষ্টি কেনা বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের পরিচিত অংশ। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, উৎসবের আয়োজন কিংবা বিশেষ কোনো আনন্দের সংবাদ বিভিন্ন উপলক্ষে মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার রীতি রয়েছে। জামতলার সাদেক গোল্লাও স্থানীয় মানুষের এই অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি মিষ্টি নয়, যশোরের একটি এলাকার পরিচিতি বহনকারী খাদ্যপণ্য হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।

জলযোগের লুচি-ডালে ১৩৩ বছরের পথচলা: যশোর শহরের পুরোনো খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জলযোগ অন্যতম। ১৮৯৩ সালে কালীপদ বিশ্বাসের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ২০২৬ সাল হিসাবে এর পথচলা ১৩৩ বছরে পৌঁছেছে। তিন প্রজন্মের হাত ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান এখনো লুচি, ডাল ও মিষ্টির জন্য পরিচিত।

শহরের চৌরাস্তা এলাকায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সড়ক, স্থানীয়ভাবে রেল রোড নামে পরিচিত সড়কের পাশে জলযোগের অবস্থান। সকাল থেকে এখানে লুচি ও ডালের নাশতা খেতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ দোকানে বসে খান, কেউ বাড়ি কিংবা কর্মস্থলের জন্য খাবার নিয়ে যান।

জলযোগের পরিচিত খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে গরম লুচি, ডাল, সবজি, চমচম, কালোজাম, রসমালাই, পানতোয়া, মিহিদানা ও দই। তবে নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশের জন্য প্রতিষ্ঠানটির আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে খেজুরের গুড়ের এই মিষ্টির চাহিদা বাড়ে বলে প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্ণধার সাধন বিশ্বাসের পরিবারের হাত ধরে ব্যবসাটি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের কর্মী ও পুরোনো ক্রেতাদের স্মৃতিতেও জায়গা করে নিয়েছে জলযোগ। কারও কাছে এটি সকালের নাশতার পরিচিত ঠিকানা, কারও কাছে যশোরে এলে পুরোনো স্বাদ ফিরে পাওয়ার জায়গা।

একটি ছোট খাবারের প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে, জলযোগ তার উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে খাবারের বাজারে পরিবর্তন এলেও পুরোনো স্বাদ, পরিচিত পরিবেশ ও ক্রেতাদের অভ্যাস প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

ঘরোয়া রান্নায় নারিকেলি মুরগি ও ঘাটকোল: যশোরের খাদ্যসংস্কৃতির আরেকটি দিক হলো স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি বিশেষ রান্না। নারিকেলি মুরগি তেমনই একটি পদ। নাম থেকেই বোঝা যায়, এ রান্নায় নারিকেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। নারিকেল ও মসলার সমন্বয়ে মুরগির মাংস রান্না করে তৈরি করা হয় ভিন্ন স্বাদের খাবার। তবে পরিবার ও রাঁধুনিভেদে এর প্রস্তুতপ্রণালিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

অন্যদিকে ঘাটকোল, যা ঘেঁটকচু নামেও পরিচিত, স্থানীয় রান্নার বৈচিত্র্যের একটি উদাহরণ। এ উদ্ভিদের উপযুক্ত অংশ রান্না করে ভর্তা, ভাজি কিংবা তরকারি হিসেবে পরিবেশন করা হয়। কোনো কোনো রান্নায় কাঁঠালের বিচি ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও নারিকেলের দুধের সঙ্গে ঘাটকোল রান্না করা হয়।

এ ধরনের পদ দেখায়, আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে ওঠে কেবল দামি বা বহুল প্রচলিত উপকরণ দিয়ে নয়; স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ, পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও রান্নার নিজস্ব কৌশলও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব খাবারের জনপ্রিয়তা অঞ্চল ও পরিবারভেদে ভিন্ন হতে পারে।
খেজুরের গুড়, পিঠাপুলি ও শীতের আয়োজন: যশোরের খাদ্যঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহ এবং তা জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের পরিচিত দৃশ্য। এই গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস ও নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়।

নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশের মতো মিষ্টি ঐতিহ্যবাহী উপকরণের সঙ্গে আধুনিক মিষ্টি তৈরির কৌশলের সংযোগ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে ভাপা পিঠা, পুলি ও পায়েসের মতো খাবার পরিবারকেন্দ্রিক উৎসব ও শীতের আয়োজনকে আরও আনন্দময় করে তোলে।

খাদ্যসংস্কৃতির এই দিকটি যশোরের গ্রামীণ জীবন ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। গুড় উৎপাদন, মিষ্টি তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে খাবারের ঐতিহ্য শুধু সংস্কৃতির অংশ নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি ক্ষেত্র।

ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা: যশোরের খাবারের বৈচিত্র্যকে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা হিসেবেও দেখা যায়। ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোলের মতো পারিবারিক আপ্যায়নের খাবার, জামতলার সাদেক গোল্লার মতো আঞ্চলিক মিষ্টি এবং জলযোগের মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠান—প্রতিটির রয়েছে আলাদা গল্প।

এসব খাবারের ইতিহাস, প্রস্তুতপ্রণালি ও সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের খাদ্যঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্রস্তুত, মানসম্মতভাবে পরিবেশন এবং উপযুক্ত বিপণনের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রকৃত স্বাদ ও প্রস্তুতপ্রণালি ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় উৎপাদকদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন।

সব মিলিয়ে, যশোরের খাদ্যসংস্কৃতি কোনো একক খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিথি আপ্যায়নের ছিটেরুটি ও কুকড়োর লাল ঝোল, জামতলার সাদেক গোল্লা, জলযোগের লুচি-ডাল ও নলেন গুড়ের সন্দেশ, কিংবা ঘরোয়া রান্নার ঘাটকোল—প্রতিটি খাবার এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র স্বাদের পরিচয় তুলে ধরে। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারলে যশোরের খাবার কেবল স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে নয়, দেশের বৃহত্তর খাদ্যসংস্কৃতিতেও আরও সুপরিচিত হয়ে উঠতে পারে।