Dhaka ০১:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক মিনিটের পরীক্ষায় মিলবে হৃদযন্ত্রের ঝুঁকির সংকেত

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা কেমন, তা বুঝতে বড় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগেই একটি সহজ সূচক সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন আপনি। শরীরচর্চা বন্ধ করার পর এক মিনিটে হৃৎস্পন্দন কতটা কমছে, তা থেকে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘হার্ট রেট রিকভারি’ (এইচআরআর) নামে পরিচিত এই পরিমাপ হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘হার্ট রেট রিকভারি’ বা সংক্ষেপে এইচআরআর (HRR)। সাধারণ নিয়মে, শারীরিক পরিশ্রম বা কসরত চলাকালীন পেশিতে বাড়তি রক্ত ও অক্সিজেন জোগাতে হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে যায়। তবে শরীরচর্চা থামিয়ে দেওয়ার পরপরই হৃৎস্পন্দন আবার ধাপে ধাপে কমতে শুরু করে। শরীর কতটা দ্রুত স্বাভাবিক এই ছন্দে ফিরে আসছে, তার গতি মূলত হৃদপিণ্ড ও স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বিত কার্যকারিতার একটি নিখুঁত প্রতিফলন।

এই পরীক্ষাটির গুরুত্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় গবেষকেরা প্রায় ২ হাজার ৪০০ ব্যক্তির ওপর দীর্ঘ ছয় বছর ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালান। গবেষণায় দেখা যায়, শরীরচর্চা থামানোর পর যাদের হৃৎস্পন্দন ধীরে কমছিল, পর্যবেক্ষণের মেয়াদকালে অন্যদের তুলনায় তাদের সার্বিক মৃত্যুঝুঁকি ছিল প্রায় চার গুণ বেশি। গবেষকেরা তখন দেখান যে, শরীরচর্চা-পরবর্তী হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হওয়ার হার শরীরের সার্বিক সুস্থতার এক নির্ভরযোগ্য জৈবিক সূচক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃৎস্পন্দন ধীরে কমা মানেই কোনো ব্যক্তির নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়া নয়; বরং এটি হৃদযন্ত্রের বাড়তি যত্ন নেওয়ার আগাম সতর্কবার্তা।

ঘরে বসেই অত্যন্ত সহজে যে কেউ এই পরিমাপ করতে পারেন। পদ্ধতিটি খুবই সাধারণ—ভারী কোনো ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের হৃৎস্পন্দন মেপে সংখ্যাটি মনে রাখতে হবে। এরপর ঘড়ি ধরে ঠিক এক মিনিট পূর্ণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও হৃৎস্পন্দন মাপতে হবে। প্রথম পরিমাপের সংখ্যা থেকে দ্বিতীয়বারের পরিমাপের সংখ্যা বাদ দিলেই পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত ‘হার্ট রেট রিকভারি’।

চিকিৎসকদের সাধারণ মানদণ্ড অনুযায়ী, শরীরচর্চা থামানোর প্রথম এক মিনিটের মধ্যে হৃৎস্পন্দন অন্তত ১৮ বিট (বার) বা তার বেশি কমে যাওয়াকে সুস্বাস্থ্যের ভালো লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, প্রথম মিনিটে হৃৎস্পন্দন যদি ১২ বিটের কম কমে, তবে তা হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা বা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি পরোক্ষ সংকেত হতে পারে। অবশ্য ব্যক্তির বয়স, সার্বিক শারীরিক সুস্থতা এবং ব্যায়ামের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যার তারতম্য ঘটতে পারে।

যাঁদের হার্ট রেট রিকভারির গতি ধীর, নিয়মিত সুষম শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা এই সক্ষমতা বাড়াতে পারেন। প্রতিদিন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা সাঁতার কাটার মতো সহনশীল অ্যারোবিক ব্যায়াম হৃদযন্ত্রের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত স্বাভাবিক করার গতি বাড়ায়।

তবে যেকোনো নতুন ব্যায়ামের রুটিন শুরু করার ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে মধ্যবয়সী বা পূর্ব থেকে শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তিদের নতুন কোনো কসরত শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া ব্যায়াম চলাকালে বুকে কোনো ধরনের ব্যথা বা চাপ অনুভূত হলে, মাথা ঘুরলে কিংবা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

এক মিনিটের এই সহজ পরীক্ষা কোনো চূড়ান্ত রোগনির্ণয় বা ভবিষ্যতের অকাট্য পূর্বাভাস নয়; এটি মূলত হৃদযন্ত্রের নীরব অবস্থার এক আগাম সঙ্কেতবাহী আয়না মাত্র। শরীর সব সময় বড় কোনো ব্যথার মাধ্যমে বিপদের পূর্বাভাস দেয় না, অনেক সময় এমন সূক্ষ্ম ছন্দপতনের মাঝেই লুকিয়ে থাকে নিজেকে সুস্থ রাখার প্রথম সুযোগ।

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

seven + two =

About Author Information

এক মিনিটের পরীক্ষায় মিলবে হৃদযন্ত্রের ঝুঁকির সংকেত

Update Time : ০২:০৫:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা কেমন, তা বুঝতে বড় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগেই একটি সহজ সূচক সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন আপনি। শরীরচর্চা বন্ধ করার পর এক মিনিটে হৃৎস্পন্দন কতটা কমছে, তা থেকে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘হার্ট রেট রিকভারি’ (এইচআরআর) নামে পরিচিত এই পরিমাপ হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘হার্ট রেট রিকভারি’ বা সংক্ষেপে এইচআরআর (HRR)। সাধারণ নিয়মে, শারীরিক পরিশ্রম বা কসরত চলাকালীন পেশিতে বাড়তি রক্ত ও অক্সিজেন জোগাতে হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে যায়। তবে শরীরচর্চা থামিয়ে দেওয়ার পরপরই হৃৎস্পন্দন আবার ধাপে ধাপে কমতে শুরু করে। শরীর কতটা দ্রুত স্বাভাবিক এই ছন্দে ফিরে আসছে, তার গতি মূলত হৃদপিণ্ড ও স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বিত কার্যকারিতার একটি নিখুঁত প্রতিফলন।

এই পরীক্ষাটির গুরুত্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় গবেষকেরা প্রায় ২ হাজার ৪০০ ব্যক্তির ওপর দীর্ঘ ছয় বছর ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালান। গবেষণায় দেখা যায়, শরীরচর্চা থামানোর পর যাদের হৃৎস্পন্দন ধীরে কমছিল, পর্যবেক্ষণের মেয়াদকালে অন্যদের তুলনায় তাদের সার্বিক মৃত্যুঝুঁকি ছিল প্রায় চার গুণ বেশি। গবেষকেরা তখন দেখান যে, শরীরচর্চা-পরবর্তী হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হওয়ার হার শরীরের সার্বিক সুস্থতার এক নির্ভরযোগ্য জৈবিক সূচক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃৎস্পন্দন ধীরে কমা মানেই কোনো ব্যক্তির নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়া নয়; বরং এটি হৃদযন্ত্রের বাড়তি যত্ন নেওয়ার আগাম সতর্কবার্তা।

ঘরে বসেই অত্যন্ত সহজে যে কেউ এই পরিমাপ করতে পারেন। পদ্ধতিটি খুবই সাধারণ—ভারী কোনো ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের হৃৎস্পন্দন মেপে সংখ্যাটি মনে রাখতে হবে। এরপর ঘড়ি ধরে ঠিক এক মিনিট পূর্ণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও হৃৎস্পন্দন মাপতে হবে। প্রথম পরিমাপের সংখ্যা থেকে দ্বিতীয়বারের পরিমাপের সংখ্যা বাদ দিলেই পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত ‘হার্ট রেট রিকভারি’।

চিকিৎসকদের সাধারণ মানদণ্ড অনুযায়ী, শরীরচর্চা থামানোর প্রথম এক মিনিটের মধ্যে হৃৎস্পন্দন অন্তত ১৮ বিট (বার) বা তার বেশি কমে যাওয়াকে সুস্বাস্থ্যের ভালো লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, প্রথম মিনিটে হৃৎস্পন্দন যদি ১২ বিটের কম কমে, তবে তা হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা বা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি পরোক্ষ সংকেত হতে পারে। অবশ্য ব্যক্তির বয়স, সার্বিক শারীরিক সুস্থতা এবং ব্যায়ামের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যার তারতম্য ঘটতে পারে।

যাঁদের হার্ট রেট রিকভারির গতি ধীর, নিয়মিত সুষম শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা এই সক্ষমতা বাড়াতে পারেন। প্রতিদিন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা সাঁতার কাটার মতো সহনশীল অ্যারোবিক ব্যায়াম হৃদযন্ত্রের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত স্বাভাবিক করার গতি বাড়ায়।

তবে যেকোনো নতুন ব্যায়ামের রুটিন শুরু করার ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে মধ্যবয়সী বা পূর্ব থেকে শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তিদের নতুন কোনো কসরত শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া ব্যায়াম চলাকালে বুকে কোনো ধরনের ব্যথা বা চাপ অনুভূত হলে, মাথা ঘুরলে কিংবা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

এক মিনিটের এই সহজ পরীক্ষা কোনো চূড়ান্ত রোগনির্ণয় বা ভবিষ্যতের অকাট্য পূর্বাভাস নয়; এটি মূলত হৃদযন্ত্রের নীরব অবস্থার এক আগাম সঙ্কেতবাহী আয়না মাত্র। শরীর সব সময় বড় কোনো ব্যথার মাধ্যমে বিপদের পূর্বাভাস দেয় না, অনেক সময় এমন সূক্ষ্ম ছন্দপতনের মাঝেই লুকিয়ে থাকে নিজেকে সুস্থ রাখার প্রথম সুযোগ।